ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার

শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে গত সোমবার। গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবার পাসের হার কম। ফলে এ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ কেউ এটিকে শিক্ষার বিপর্যয় বলে মনে করছেন। কেউ আবার কঠোর মূল্যায়নকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষার মান বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের ফলকে বিপর্যয় হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ইংরেজি ও গণিতে অধিকাংশ বোর্ডের হতাশাজনক ফল হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডের পাসের হারও এক বছরের ব্যবধানে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এবার সারা বাংলাদেশে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। পরীক্ষার্থীর বিস্তারিত পরিসংখ্যান বলছে, ছাত্র সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন। ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, ছাত্রদের ছিল ৫৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষভাবে নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে ফলের উজ্জ্বল চিত্র ফুটিয়ে তোলার একটি অভিযোগ সর্বদায়ই উঠতে দেখা যায়। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা সর্বদা এ প্রবণতার সমালোচনা করে আসছেন। এ থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ সর্বদাই দিতে দেখা গেছে। এবার সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে, এমনটি যদি হয়, তাহলে এ ফলকে প্রকৃত মূল্যায়ন হিসেবে ভাবা আনন্দদায়ক ও প্রশংসনীয়। তবে বাস্তব চিত্র কি সত্যিই তাই, এ প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যায়। কেননা শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের অনেকের মত কিন্তু ভিন্ন। তারা এটাকে খারাপ ফল হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করছেন, এটিকে ‘সুন্দর’ আখ্যা দিয়ে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অজুহাত না খুঁজে এর পেছনের মূল কারণ চিহ্নিত করাই এখন নীতিপ্রণেতাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব। শহরকেন্দ্রিক কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে মফস্বল ও গ্রামীণ পর্যায়ে বিশেষায়িত বিষয়ে মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। তদুপরি, মুখস্থনির্ভর ও মূল্যায়নকেন্দ্রিক পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ধারণা পোক্ত করে না। এর বদলে শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কৌশলে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রমের মৌলিক ভিত্তিটুকু অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা মনে করি, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি হযবরল অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি রয়েছে দক্ষ জনশক্তি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ নানা দুর্বলতা। শ্রেণিকক্ষে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা, ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করা সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো বাস্তবতা নেই। শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে মাতামাতি না করে, উচিত বাস্তবিক ও সময়োপযোগী একটি ব্যবস্থা দাঁড় করানো। কেননা প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন, যা আজও আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত