প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন কিছু ঝুঁকিরও জন্ম দিয়েছে। আর সেই ঝুঁকির অন্যতম বড় ক্ষেত্র হলো সাইবার অপরাধ, যার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য নারী। বর্তমান বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবন যাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারিসেবা, বিনোদন সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রভাব আজ সুস্পষ্ট। বাংলাদেশও ডিজিটাল রূপান্তরের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। দেশের নারীরা আজ অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু এ অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীরা অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং পরিচয় চুরির মতো অপরাধের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাইবার নিরাপত্তা বলতে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, তথ্য, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক এবং অনলাইন অ্যাকাউন্টকে অবৈধ প্রবেশ, তথ্য চুরি, হ্যাকিং, ভাইরাস ও অন্যান্য ডিজিটাল আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখাকে বোঝায়। একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও, আর্থিক তথ্য এবং অনলাইন পরিচয় নিরাপদ রাখা সাইবার নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে মানুষের জীবনের একটি বড় অংশ অনলাইনের সঙ্গে যুক্ত। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নারীরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এসবপ্ল্যাট ফর্মে তারা নানা ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অশালীন মন্তব্য, আপত্তিকর বার্তা, ভুয়া আইডি থেকে বিরক্ত করা, ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা- এসব ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা, ভয় বা মানসিক চাপের কারণে এসব বিষয়ে অভিযোগও করেন না।
সাইবার অপরাধের আরেকটি ভয়াবহ রূপ হলো ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাক মেইল করা। অনেক সময় ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি সংগ্রহ করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় অথবা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করেও নারীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এসব অপরাধ শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন নয়, তার পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক অবস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ফিশিং বর্তমানে অন্যতম সাধারণ সাইবার প্রতারণা। প্রতারকরা ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত কোনো সংস্থার নাম ব্যবহার করে ভুয়া বার্তা পাঠায় এবং ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা ব্যাংক তথ্য সংগ্রহ করে। অনেকেই না বুঝে এসব তথ্য শেয়ার করেন। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল আর্থিক সেবার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বন্ধু বা আত্মীয়দের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে সাইবার বুলিং একটি উদ্বেগ জনক সমস্যা।
অনলাইনে অপমান, বিদ্রূপ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করাহয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং পড়াশোনায় অনীহার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই অনলাইন হয়রানিকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়। নারীর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দুইস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখলে অ্যাকাউন্ট আরও নিরাপদ থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক তথ্য, ওটিপি কিংবা বাসার ঠিকানা প্রকাশ করা উচিত নয়।
অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো লিংক, ফাইল বা অ্যাপ ডাউন লোড করার আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে বিরত না রেখে নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে তারা অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে সহজেই জানাতে পারে। অনেক সময় ভয় বা লজ্জার কারণে কিশোরীরা সমস্যার কথা গোপন রাখে, যা পরে বড় সংকটে পরিণত হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার অপরাধ শনাক্তকরণ এবং অনলাইন নৈতিকতা বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির সুফল গ্রহণের পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবিলার দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। সরকারের দায়িত্বহলো সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলার ক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে তারা দ্রুত অপরাধ শনাক্ত ও দমন করতে পারে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা কারী প্রতিষ্ঠান গুলোর উচিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ করা এবং ব্যবহারকারীর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ গোপনীয়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর ডিজিটাল ক্ষমতায়নের জন্য প্রযুক্তি শিক্ষায়তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে তারা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তির উদ্ভাবক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। এতে দেশের প্রযুক্তি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের কাজ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। অনলাইনে শালীন আচরণ, অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নারী সাইবার হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে সহযোগিতা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা উচিত।
ডিজিটাল যুগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই দেশের উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নেতৃত্ব বিকাশ সম্ভবনয়। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সচেতনতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কার্যকর আইন এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে প্রতিটি নারী ভয়হীনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশ করবেন এবং দেশের উন্নয়নে সমানভাবে অবদান রাখবেন। একটি নিরাপদ সাইবার পরিবেশ হতে পারে নারীর ক্ষমতায়ন এবং একটি আধুনিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক, সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়