প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শরতের শেষ প্রহরে নীল আকাশজুড়ে এক বিষাদময় নীরবতা নেমে আসে। হিমেল হাওয়া জানান দেয় শুভ্রতার বিদায় বেলা ঘনিয়ে এসেছে। প্রকৃতির এ ক্রান্তিকালে চারপাশের সবুজ কাননে এক অদ্ভুত রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। কোনো কৃত্রিম আয়োজন ছাড়াই মাঠ-ঘাট মেঠোপথ সেজে ওঠে এক অলৌকিক আভায়। এই বিদায়ীলগ্নে প্রকৃতির কোলে ফোটে এমন কিছু ফুল যা কোনো ভেদাভেদ চেনে না। সবাই আজ সমান। নদীর ধারে শুভ্রতার চাদর বিছিয়ে কাশফুল আপন মনে দোল খায়। শরতের বিদায় লগ্নেও এ ফুলের শুভ্র রূপ এতটুকু ম্লান হয় না। ধনী মানুষের বিলাসী বাগান কিংবা দরিদ্র কৃষকের ভাঙা কুঁড়েঘরের পাশের নদীর চর সর্বত্রই এর সমান অধিকার। রাজা কিংবা প্রজা সবার চোখকে সমান তৃপ্তি দেয় এ ফুল। প্রকৃতির এ দান মানবসৃষ্ট কোনো দেয়াল বা সুন্দর সীমানা প্রাচীর মোটেও মানে না।
ভোরের শিশির ভেজা ঘাসের ওপর টুপটুপ করে ঝরে পড়ে শিউলি ফুল। কমলা রঙের বোঁটা আর সাদা পাপড়ির এ মিলন যেন এক চিরন্তন সত্য। রাজপ্রাসাদের আঙিনায় যেমন এর সুবাস ছড়ায় তেমনই এক হতদরিদ্রের আঙিনাও সুগন্ধে মৌ-মৌ করে। এ ফুল ঝরে পড়ার সময় কোনো রাজকীয় আয়োজন খোঁজে না। মাটির বুকেই সে তার সুন্দর শেষ আশ্রয় খুঁজে নেয় অতি সহজে পরম সুখে। ঝিলের শান্ত ও নীলাভ জলে মাথা উঁচু করে ফোটে রক্ত ও সাদা শাপলা।
গ্রামীণ জনপদের এই সাধারণ ফুলটি কোনো আভিজাত্যের তোয়াক্কা করে না। কোটিপতির সুইমিং পুলে এর ম্লান না হলেও প্রকৃতির উন্মুক্ত জলাশয়ে এর অবাধ বিচরণ। দ্বীনদরিদ্র মানুষের ক্ষুধা মেটাতে কিংবা রাজার টেবিলের সৌন্দর্য বাড়াতে এর ভূমিকা সমান্তরাল। শাপলা ফুলটি তাই সাম্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে চিরকাল অতি ভাস্বর দৃশ্য। পঙ্কিল জলাশয়ে জন্ম নিয়েও আপন মহিমায় বিকশিত হয় পরম পদ্ম ফুল। তার এই রূপের সুধা পান করতে কোনো রাজকীয় সনদের প্রয়োজন হয় না। পথের ধারের অবহেলিত শিশুটি যেমন এই ফুলের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয় তেমনই সিংহাসনে বসা সম্রাটও এর মোহে পড়েন। প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি প্রমাণ করে যে উৎপত্তির দীনতা কখনো ভেদাভেদের বড় কারণ হতে পারে না। সবাই এখানে সমান। ঝোপঝাড়ের আড়ালে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা কামিনী ফুল তার তীব্র সুবাস ছড়ায়। রাতের অন্ধকারে যখন এই ফুল ফোটে, তখন সে সুগন্ধ বিতরণে কোনো কৃপণতা করে না। ধনীর অট্টালিকা কিংবা গরিবের ছন বাঁশের ঘর সবখানেই এ সুবাস সমানভাবে পৌঁছে যায়। সুগন্ধের কোনো জাত বা শ্রেণি নেই তা এ কামিনী ফুল তার নীরব উপস্থিতির মাধ্যমে আমাদের প্রতিনিয়ত খুব ভালো সুন্দর শিক্ষা দেয়। শরতের বিদায়লগ্নে ছাতিম গাছের ডালে ডালে ফোটে হালকা সবুজ রঙের ফুল। এর তীব্র ও মাদকতাময় সুবাস পুরো আকাশ বাতাসকে এক মায়াবী জালে জড়িয়ে ফেলে।
পথিক যখন ক্লান্ত হয়ে এই গাছের নিচে আশ্রয় নেয়, তখন সে মহান রাজা নাকি ভিখারি তা ছাতিম ফুল বিচার করে না। সবাইকে সমানভাবে ক্লান্তিহীন সুবাস বিলিয়ে দিয়ে সে প্রকৃতির বুকে এক নতুন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সাদা ডানার প্রজাপতির মতো দেখতে দোলনচাঁপা ফুল তার স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এ ফুলের দিকে তাকালে মনের সব কলুষতা নিমেষেই দূর হয়ে যায়। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে যে কেউ এ ফুলের ঘ্রাণ নিতে পারে নির্দ্বিধায়। কোনো বাজারে এর সুবাস বিক্রি হয় না বরং প্রকৃতির অকৃপণ দানে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। মানুষের গড়া সব সামাজিক বৈষম্যকে সে বুড়ো আঙুল দেখায়।
বুনো লতার ফাঁকে মৃদু হেসে ফোটে বুনো মল্লিকা ফুল। অতি সাধারণ এই ফুলটির দিকে হয়তো অনেকের নজর পড়ে না; কিন্তু এর ভেতরের সৌন্দর্য অপরিসীম। এ ফুলটি কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত নয়। বনের পশু পাখি থেকে শুরু করে সমাজের উঁচু নিচু সর্বস্তরের মানুষ এর সান্নিধ্য পায় সমানভাবে। নিজের অস্তিত্বকে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সে আমাদের সমাজের বুকে গভীর একতা প্রচার করে। শরতের এ বিদায়ী ফুলগুলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য সাম্যের শিক্ষা দেয়। প্রকৃতি যেভাবে তার সুধা ও সৌন্দর্য ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে কোনো পার্থক্য না করে বিলিয়ে দেয়, মানুষেরও উচিত সেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। জাত প্রথার দেয়াল ভেঙে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলাই হলো প্রকৃতির প্রধান বার্তা। আমরা যদি এই শিক্ষা গ্রহণ করি তবে পৃথিবীতে কোনো কলহ থাকবে না। ঝরে পড়া শিউলি আমাদের শেখায় কীভাবে চরম সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও মাটিতে মিশে থাকতে হয়। সুবাস ছড়িয়ে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ার মাঝে যে আত্মত্যাগ, তা আমাদের অহংকার বর্জনের দীক্ষা দেয়। ক্ষমতা বা অর্থের দম্ভে অন্ধ না হয়ে মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই জীবনের আসল সার্থকতা নিহিত। বিনম্র হওয়াই প্রকৃতির সবচেয়ে বড় অলংকার যা সবাইকে ধারণ করতে হবে পরম আদরে আজ।
কামিনী ফুল রাতের অন্ধকারে নিজের রূপ আড়াল করেও সুবাস বিলিয়ে দেয়। এটি আমাদের নিঃস্বার্থ পরোপকারের শিক্ষা দেয়। নিজের নাম বা যশের আশা না করে সমাজের অবহেলিত মানুষের উপকারে নিয়োজিত হওয়াই প্রকৃত মনুষ্যত্ব। কোনো প্রচার বা প্রতিদানের আশা ছাড়াই যখন আমরা অন্যেও মুখে হাসি ফোটাতে পারব, তখনই আমাদের জীবন সার্থক হবে। ফুলেরা কোনো প্রতিদান ছাড়াই অবিরত সুবাস দিয়ে সুন্দর মুগ্ধ করে। কাদা বা পঙ্কিল জলে জন্মেও পদ্ম যেভাবে নিজের পবিত্রতা ও সৌন্দর্য ধরে রাখে, তা এক পরম শিক্ষণীয় বিষয়।
আমাদের চারপাশের সমাজ যতই কলুষিত হোক না কেন, নিজের আদর্শ ও সততা ধরে রাখা সম্ভব। প্রতিকূল পরিবেশ কখনো মানুষের ভেতরের ভালো গুণগুলোকে নষ্ট করতে পারে না যদি ইচ্ছা থাকে দৃঢ়। পদ্মের মতো আমাদেরও সমাজের সব পঙ্কিলতা দূর করে বিকশিত হতে হবে সুন্দরভাবে। নদীর চরের কাশফুল কোনো বিশেষ যত্নের আশা না করেই আপন মনে ফোটে এবং সবাইকে আনন্দ দেয়। এ নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আনন্দ বিলানোর গুণটি মানুষের আত্মস্থ করা প্রয়োজন। কোনো স্বার্থ বা শর্ত ছাড়া যখন আমরা সমাজকে ভালোবাসতে পারব, তখনই প্রকৃত সুখ আসবে। ফুলেরা যেমন কোনো কিছুর বিনিময়ে আনন্দ দেয় না, মানুষের ভালোবাসাও তেমন পবিত্র এবং সম্পূর্ণ শর্তহীন হওয়া উচিত এ যুগে।
ছাতিম ফুলেরা কখনও একা ফোটে না, তারা সবসময় থোকায় থোকায় দলবদ্ধভাবে ফোটে। এ দৃশ্য আমাদের সামাজিক একতা ও সংহতির শিক্ষা দেয়। বিচ্ছিন্ন্নভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে দলবদ্ধভাবে কাজ করলে যেকোনো বড় বাধা দূর করা সম্ভব।
সমাজের সব শ্রেণির মানুষ যখন একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করবে, তখন কোনো বৈষম্য টিকে থাকতে পারবে না। একতাই বল— ছাতিম ফুল আমাদের এ ধ্রুব সত্য মনে করিয়ে দেয়।
বুনো মল্লিকার মতো সাধারণ ফুলগুলো আমাদের জীবনে সরলতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। বাহ্যিক চাকচিক্য বা জাঁকজমক ছাড়াও যে সুন্দর ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করা যায়, তা এ ফুলগুলোর সরল উপস্থিতি প্রমাণ করে। আভিজাত্যের চেয়ে মনের ভেতরের সরলতাই মানুষকে প্রকৃত সুন্দর করে তোলে। সরল জীবন ও উচ্চ চিন্তা করার মাধ্যমে আমরা সমাজে এক নতুন এবং ভালো পরিবর্তন আনতে পারি সহজে।
শরতের ফুলের স্বল্পস্থায়ী জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। ক্ষমতা,প্রতিপত্তি কিংবা অহংকার— সবই একদিন সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যাবে। এ সত্যটি অনুধাবন করলে মানুষের মন থেকে লোভ ও হিংসা দূর হয়ে যায়। ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে যতটুকু সম্ভব মানুষের কল্যাণ করা এবং ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে ফুলেরা সদা অবিরত জানায়।শাপলা ফুল যেভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত জলাশয়ে ফোটে, তা আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থার তাগিদ দেয়। সমাজের কোনো মানুষ যেন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে সবাইকে সমান সুযোগ দিলে রাষ্ট্র ও সমাজ আরও সুন্দর হবে।
ফুলেরা যেভাবে সবাইকে আপন করে নেয়, মানুষের মনকেও ঠিক তেমনই সংকীর্ণতা মুক্ত এবং সর্বদা বিশাল করতে হবে আজ। দোলনচাঁপার বাইরের শুভ্রতা যেমন সুন্দর, তার ভেতরের সুবাসও তেমনই মনোহর। এটি আমাদের বাহ্যিক রূপের চেয়ে অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর বিকাশে মনোযোগী হতে শেখায়। মানুষের আসল পরিচয় তার পোশাকে বা চেহারায় নয়, বরং তার চরিত্র ও ব্যবহারে। অভ্যন্তরীণ সুন্দর গুণগুলোই মানুষকে সমাজে স্মরণীয় করে রাখে। ফুলের মতো আমাদেরও নিজেদের মনকে সুবাসিত ও পবিত্র করতে হবে যাতে সবাই সমানভাবে পরম উপকৃত হতে পারে আজ। শরতের এই বাদল দিনে আমার বলতে ইচ্ছে করছে— শরতের বিদায় বেলায় ফোটে এক বৈষম্যহীন নতুন আলোর শুভ্র জ্যোতি। ফুলেরা ভালোবেসে বলে জগতের সব মানুষকে ভালোবাসো পরম পরম প্রীতি। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা এখানে নেই কোনো কৃত্রিম চিরন্তন ভেদাভেদ। প্রকৃতির অকৃপণ দানে নিমেষেই মুছে যায় সব মনের গভীর ক্ষেদ। সুগন্ধে আকুল হোক অবনী জুড়িয়া সব মানুষের তৃষিত ব্যাকুল প্রাণ। ধরণীর বুকে সদা ধ্বনিত হোক এ সাম্যের পরম অনাবিল গান।
শরতের বিদায়লগ্নে প্রকৃতির এ বৈষম্যহীন ফুলেরা মানুষের চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করে। এরা আমাদের সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার ও কৃত্রিম বৈষম্য দূর করার নীরব আহ্বান জানায়। ফুলের এ সাম্যের বাণী যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবেই সমাজ সুন্দর হবে। প্রকৃতির এ মহান শিক্ষা হোক আমাদের সুন্দর ও মানবিক পথচলার চিরন্তন পাথেয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক।