প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও একটু উন্নত জীবনের আশায় বহু মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমান। এই প্রবাস জীবনের কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে পরিবারে আসে আর্থিক নিরাপত্তা; কিন্তু সেই স্বচ্ছলতার আড়ালে চাপা পড়ে যায় এক নীরব, করুণ বাস্তবতা বাবা-মায়ের স্নেহ ও উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত শিশুদের মানসিক যন্ত্রণা। বিশেষ করে যখন কোনো শিশুর বাবা, মা কিংবা উভয়েই দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেন, তখন শুধু বাবা-মায়ের মনেই নয়, শিশুটির ভেতরেও জন্ম নেয় গভীর শূন্যতা ও আবেগী একাকিত্ব।
?প্রবাসে যাওয়া মানুষটি হয়তো পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে দূরদেশে পাড়ি জমান, কিন্তু কখনও কখনও সেই ভবিষ্যৎ গড়ার পথে সন্তানের বর্তমানটিই নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে থাকে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শারীরিক বিকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানসিক বিকাশও সমান জরুরি। শিশুর সুস্থ ও পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য বাবা-মায়ের ভালোবাসা, স্নেহ, পাশে থাকা এবং আবেগী সংযোগ অপরিহার্য।
কিন্তু প্রবাসী শিশুদের একটি বড় অংশ এই স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত থাকে।
বাবা কিংবা মা, কখনও বা উভয়েই দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় এসব শিশুরা দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা নিকট আত্মীয়দের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠে। এতে তাদের মৌলিক ও বাহ্যিক চাহিদা পূরণ হলেও অভ্যন্তরীণ আবেগীয় চাহিদা থেকে যায় অপূর্ণ। শিশুর কাছে ভালোবাসা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তার মানসিক বিকাশের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন।
?এ অপূর্ণতাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় মানসিক সংকটে। অনেক শিশুর মনে জন্ম নেয় ভ্রান্ত ধারণা তারা ভাবতে শুরু করে, বাবা-মা হয়তো তাদের ছেড়ে গেছেন বা তারা আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এ ধারণা থেকেই তৈরি হয় অভিমান, ক্ষোভ ও একাকিত্ব। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অনুভূতি আরও গভীর হয়। ফলে শিশুরা নিজেদের আবেগ প্রকাশে সংকোচবোধ করে, সহজে অন্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না কিংবা অকারণে জেদ, রাগ ও আচরণগত সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে। এসব আচরণ আসলে তাদের ভেতরে জমে থাকা চাপা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। একটি শিশু সবসময় বলতে পারে না সে কষ্ট পাচ্ছে; অনেক সময় তার নীরবতা, রাগ কিংবা জেদই হয়ে ওঠে তার কষ্টের ভাষা।
?মানসিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও। অনেক শিশু মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, ফলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ ভালো ফলাফলের মাধ্যমে অভিভাবকের অনুপস্থিতি পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে। এ চাপ থেকে জন্ম নেয় হতাশা, দুশ্চিন্তা ও দীর্ঘস্থায়ী মনঃকষ্ট যা আমাদের সমাজে প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়।
প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কল, ভয়েস মেসেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বাবাুমায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হলেও তা কখনোই প্রকৃত উপস্থিতির বিকল্প হতে পারে না।
সন্তানের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা গল্প শোনার মতো ছোট ছোট আবেগীয় মুহূর্তগুলোর শূন্যতা থেকেই যায়।
প্রযুক্তি দূরত্ব কিছুটা কমালেও হৃদয়ের দূরত্ব পুরোপুরি ঘোচাতে পারে না। স্ক্রিনে বাবা-মায়ের মুখ দেখা যায়, মায়ের কণ্ঠ শোনা যায়; কিন্তু শিশুর যে শূন্যতা, সেটি পূরণ হয় না একটি আলিঙ্গনের বিকল্প কোনো প্রযুক্তিতে।
আমাদের সমাজে প্রবাসী পরিবারের সন্তানদের প্রায়ই ভাগ্যবান বলে মনে করা হয়, কারণ তাদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের মানসিক কষ্টকে আড়াল করে দেয়। দামি খেলনা কিংবা বাহ্যিক স্বাচ্ছন্দ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাবা-মাকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার এক গভীর অভাব।
২০১৯ সালের পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় ৩-৪ বছর বয়সী ৮,৮৩৩ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় ২৯ শতাংশ শিশু প্রত্যাশিত বিকাশের পর্যায়ে ছিল না। গবেষণায় আরও দেখা যায়, কোনো অভিভাবক প্রবাসে না থাকা শিশুদের তুলনায় বাবা প্রবাসে থাকা শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের অনুকূল অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা ২৬ শতাংশ কম; আর উভয় অভিভাবক প্রবাসে থাকলে তা ৩৭ শতাংশ কম।
গবেষণাটি তাই অভিভাবকের প্রবাসযাত্রা ও শিশুর প্রাথমিক বিকাশের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, অভিভাবকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি শিশুদের শিক্ষাগত, আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও আচরণগত সমস্যা বাড়ে। গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই এই প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
?সমস্যাটিকে স্বীকার করাই সমাধানের প্রথম ধাপ। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রবাসে থাকা বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, শুধু পড়াশোনার ফলাফল নয় তার অনুভূতি, আনন্দ ও কষ্ট মনোযোগ দিয়ে শোনা।
প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে।
একই সঙ্গে যাদের তত্ত্বাবধানে শিশুরা বেড়ে ওঠে দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা আত্মীয়স্বজনদেরও দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর লালন-পালনকে কেবল দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ভালোবাসা ও সহানুভূতির জায়গা থেকে তাকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোনো বিরূপ আচরণ দেখা দিলে শাস্তির বদলে সেই আচরণের পেছনের কারণ অনুধাবন করলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হবে।
?শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে অপরিসীম। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গিয়ে বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা, শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও আলাদা নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
প্রবাসী শিশুদের মানসিক সংকট কোনো একটি পরিবারের একক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। আজ যারা নীরবে এই কষ্ট বহন করছে, তারাই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রবাস জীবনের মূল উদ্দেশ্য পরিবারকে সুখীদাবি কিন্তু সেই ত্যাগের ভার যেন শিশুদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে। এ সংকট নিরসনে সম্মিলিত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তরিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে; কিন্তু শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে ভালোবাসা, উপস্থিতি ও নিরাপদ আবেগের ভিতের ওপর।
লেখক : লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।