প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
একটি আত্মহত্যার ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছিল। আমি বিষন্ন হয়ে পড়েছিলাম। না, আমার কোনো আত্মীয় নয়, নিকটজনের নয়। তবে আমার এলাকার, গ্রামের। একজোড়া দম্পতি একসাথে এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছিল। তাদের বিয়ের বয়স ছিল এক বছরের কম। তারপরও প্রেমের বিয়ে। ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল তাদের। কিছুদিন প্রেম। তারপর বিয়ে করেছিল তারা। হঠাৎ একদিন জানা গেল তারা একসাথে আত্মহত্যা করেছে। ঘরের আড়ার সাথে রশি ঝুলানো অবস্থায় তাদের উদ্ধার করেছিল বাড়ির লোকজন ও প্রতিবেশীরা। কিন্তু কেন এই করুণ পরিণতি? কেন এই আত্মহত্যা? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে তারা।
তখন করোনাকাল চলছিল। ছেলেটি কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘদিন কাজ না-থাকায় অভাব তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। কথায় বলে, অভাব যখন দরজা দিয়ে ঢোকে, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। এ কথা উল্লেখিত দম্পতির জীবনে নির্মমভাবে বাস্তবায়ন হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, তারা জীবন থেকেই পালিয়ে গেল। এই ঘটনায় শুধু দুটো প্রাণ অকালে ঝরে যায়নি, তাদের পুরো পরিবার বিশেষ করে তাদের বাবা-মা ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ছেলেটির মা আজও পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। এমন বেদনাবিদুর ঘটনা আমাদের কখনওই কাম্য নয়। তবুও এমন অসংখ্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে পৃথিবী তথা আমাদের দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। আর নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত রয়েছে একেবারে প্রথম স্থানে। যা আমাদের জন্য ভীষণ আশঙ্কার ব্যাপার।
আমরা যদি আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে যাই তাহলে নানারকম ঘটনার সূত্রপাত আমাদের সামনে চলে আসবে। যেহেতু প্রতিটি মানুষের জীবন তাদের নিজস্ব এবং আলাদা। তাই সেই জীবনে রয়েছে নিজস্ব আনন্দ কিংবা ব্যথা-বেদনা এবং অবশ্যই তা আলাদা আলাদা। সেরকম প্রতিটি পরিবারের মধ্যেও রয়েছে আলাদা রকম সমস্যা। ব্যক্তিগত অথবা পারিবারিক যা-ই হোক না কেন মানুষের কিছু সমস্যা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন একজন মানুষ মনে করেন এগুলো থেকে তার মুক্তি নাই। ঠিক তখনই সে জীবন থেকে মুক্তি চায়, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। নানারকম কারণে মানুষ এই চরম পরিণতির দিকে নিজেকে নিয়ে যায়। কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, প্রেমে ব্যর্থতা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা আশানুরূপ ফল না-পাওয়া, পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ, মোবাইলে গেইম খেলতে বাধা দেওয়ায়, অতিরিক্ত অভিমানে, দাম্পত্য কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, যৌতুক নিয়ে সমস্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দারিদ্রতা বা সংসারে অভাব-অনটন, ব্যবসায় লোকসান হয়ে পুজি হারানো, গৃহহীনতা, নেশায় আসক্তি, নেশার দ্রব্য সংগ্রহ করতে অপারগতা, অপমান সহ্য করতে না-পারা, বৈষম্যজনিত কারণ, নিসঙ্গ জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা, জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায়, মস্তিষ্কে আঘাত, নানা কারণে মৃত্যুর ভয় কমে যাওয়া, বাবা-মায়ের কাছে সখের জিনিস না-পেয়ে, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি, ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি প্রকাশ, বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে না-পাওয়া বা হতাশা, আত্মহত্যায় পারিবারিক ঐতিহ্য, বেকারত্ব বা ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা, জুয়া খেলায় হেরে যাওয়া, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের প্ররোচনায় আত্মবলিদান, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে না-পেরেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটাচ্ছে কেউ কেউ। সাইকোলজিক্যাল সমস্যা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার কারণেও এ ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে আমাদের দেশে প্রেমে ব্যর্থ হওয়ায় এবং পরীক্ষায় ফেল করায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বেশি। আর এরা সবাই তরুণ-তরুণী। যাদের সামনে পড়ে থাকে সম্ভাবনাময় একটা পুরো জীবন।
অথচ সামান্য একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে নিজের জীবনকেই বলিদান করে দেয় এরা। মানষিক রোগ বিশেষজ্ঞগণ বলেন, সাধারণত বয়ঃসন্ধির সময়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কম থাকায় তারা হুটহাট করে এ ধরণের মারাত্মক সিদ্ধান্ত নেয়। এটা যে কত বড় বোকামি তা অনুধাবন করার ক্ষমতা বা সময় তাদের থাকে না। আর এ কারণে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয় আত্মহত্যার মতো একটা জঘন্য পরিণতির কাছে। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম আত্মহত্যাকে? মহাপাপ বলে আখ্যা দিয়েছে। সামাজিকভাবেও এটি গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। আত্মহত্যার কারণে শুধু একটি জীবনের অবসান ঘটে না, একটি পরিবার তথা সমাজের উপরও ভীষণ রকমের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ থেকে কোনো কোনো পরিবার এতই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, তাদের আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না। এতে শুধু ওই পরিবার নয় সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতিও সাধিত হয়। তাই আত্মহত্যাকে 'না' বলে এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও 'বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস' পালন করা হয়। কিছু সংগঠন আছে যারা আত্মহত্যা রোধে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তা দিবস পালনেই সমাপ্ত এবং সংগঠনের কার্যক্রমও অতিদূর গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। ব্যাপক জনসচেতনতা, পারিবারিক বন্ধন মজবুত, মানসিক রোগের চিকিৎসা, ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যৌতুক প্রথা থেকে বেরিয়ে আসা, সামাজিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও কলহের অবসান, একে অপরের প্রতি যত্নশীল, ছেলে-মেয়েদের প্রতি উদাসীন না-হওয়া, ভালোবাসার মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন আনন্দময় করে তোলা, পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকা, সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত থাকা, মাদক ব্যবসা ও জুয়া খেলা বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রহণ করে আত্মহত্যার ঘটনা বন্ধ করা যেতে পারে। যদিও এ ব্যাপারে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তা আরও প্রবলতর করা আশু প্রয়োজন। সামাজিক সম্প্রতি বৃদ্ধি করে, সমাজের নেতিবাচক মনোভাব পরিহার করতে হবে। ছোটখাট সমস্যাগুলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দ্বারা সমাধান করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ছেলেমেয়েদের মতামত ও চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে যুক্তিসঙ্গত উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রতি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের জীবন একটাই। শুধু একবারের জন্যই এই সুন্দর পৃথিবীর আলো বাতাস গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি আমরা। যত দুঃখ-বেদনাই থাকুক বেঁচে থাকার আলাদা আনন্দ আছে। কেন সামান্য কিছু কারণে নিজেকে শেষ করে দেব। কেন জীবন সংগ্রাম থেকে পালিয়ে যাব। বেঁচে থাকা তো একটা যুদ্ধ। যুদ্ধ থেকে পালায় ভীরু আর কাপুরুষেরা। আমরা কেন এই দলে নাম লেখাব। ঘাত-প্রতিঘাত তো আসবেই। সকল প্রতিকূলতা রুখে দিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
এখানে আমি তরুণদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। তাদের প্রতি রয়েছে আমার অসীম ভালোবাসা। কারণ আজকের তরুণরা আগামীদিনের সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে। তরুণদের কাছে এই বার্তা পৌঁছাতে চাই যে, তোমাদের সামনে বিরাট একটা জীবন পড়ে আছে। একটা বৈচিত্র্যময় লম্বা পথ তোমাদের সামনে। কেন একটুখানি হোঁচট খেয়ে থমকে যাবে। এতো ক্ষুদ্র আর সংকীর্ণ মানসিকতা আমরা চাই না। মনে রেখো, এ জীবনে কোনো কিছুই অনিবার্য নয়। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তী মিলেই জীবন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা আশানুরূপ ফল না-পাওয়া মানে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। এটা একটা অতি সামান্য দুর্ঘটনা মাত্র। এটা জীবনের চরম পরাজয় নয়, বরং একটুখানি হোঁচট খাওয়ার মতো ব্যাপার। আর বাবা-মা তাঁদের সমস্ত সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করে তোমাদের জন্যই। হয়তো আজকে তোমার সখের জিনিস কিনে দিতে পারছে না তাঁরা। সময় সুযোগ হলে নিশ্চয়ই দিবেন। এর জন্য অভিমান করে আত্মহত্যা করা কোনো মতেই ঠিক নয়। নিজেকে শুধরে, মনোবল শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন। সর্বোপরি জীবনকে ভালোবাসতে হবে। যা কিছু আছে তাই নিয়ে আনন্দের সাথে উপভোগ করতে হবে যাপিত জীবন। নিজেকে নিজেই শেষ করে দেওয়ার মানে সবকিছু মিটে যাওয়া নয়। বরং সমস্যা আরও তৈরি করা। তুমি ভাবছো তোমার মৃত্যু হলেই সবকিছু সমাধান হয়ে যাবে। তা কিন্তু নয়। তোমার পরিবার পরিজনের কথা ভাববে না? তোমার জীবনের সাথে মিশে থাকে আরো অনেক মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তুমি চলে গেলে কতো বড়ো সংকট তৈরি হবে তাদের জীবনে। এ কথা ভেবে দেখতে হবে তোমাকেই। অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট, পাওয়া না-পাওয়া নিয়েই জীবন। সবকিছুর উর্ধ্বে বেঁচে থাকাটাই জরুরি। সুতরাং আত্মহত্যা নয়, ঘাত-প্রতিঘাত আর প্রতিকূলতা রুখেই বাঁচতে হবে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কবি ও কলামিস্ট