ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এখন রাষ্ট্র মেরামতের সময়, রাজনৈতিক সংঘাতের নয়

ডি এম আমিরুল ইসলাম অমর
এখন রাষ্ট্র মেরামতের সময়, রাজনৈতিক সংঘাতের নয়

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতার চেয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মানুষের স্বস্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, শাসনব্যবস্থার সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতার পর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেই একটি দেশের সংকটের অবসান ঘটে না। বরং বহু বছরের জমে থাকা সমস্যার ভার নতুন সরকারের কাঁধে এসে পড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও তার ব্যতিক্রম নয়। গত দেড় দশকের বেশি সময়ে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অন্তর্বর্তী সরকারও দীর্ঘ একটি রূপান্তরকাল পরিচালনা করেছে। এর আগে ১/১১-পরবর্তী সময় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করেছিল। ফলে আজকের সংকটকে শুধু একটি সরকার বা একটি মেয়াদের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি দীর্ঘ সময়ের সঞ্চিত সমস্যার ফল। অর্থনীতির পরিসংখ্যানও স্বস্তিদায়ক নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঋণ ২০২৩-এর ৫.৮ শতাংশ থেকে ঋণ ২০২৪-এ ৪.২ শতাংশ এবং ঋণ ২০২৫-এ ৩.৭ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থেকেছে; ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও ওগঋ চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা ছোট নয়। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট। ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার— সবকিছু একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রত্যাশা। মানুষ এখন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বাজারে স্বস্তি চায়। চাকরি চায়। সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা চায়। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা চায়। ব্যবসায়ী বিনিয়োগের নিরাপত্তা চান। তরুণেরা কর্মসংস্থান চান। কৃষক ন্যায্যমূল্য চান। মধ্যবিত্ত চান সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাবটি আবার কিছুটা স্বাভাবিক হোক। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের কাছে সময়ের দাবি হচ্ছে— প্রথমে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, তারপর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তার 'I have a plan' বক্তব্যকে এখন বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, তার সাফল্য নির্ধারিত হবে মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে। তবে এখানেই সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও আছে। সরকারকে সময় প্রয়োজন, এটি যেমন সত্য, তেমনি সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচিত সরকারকে সমালোচনা থেকে মুক্ত রাখার কোনো সুযোগ নেই। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজ সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা এবং জনগণের স্বার্থে চাপ সৃষ্টি করা। সেটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ। কিন্তু বিরোধিতা এবং রাষ্ট্র অচল করার চেষ্টা এক বিষয় নয়। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি দিচ্ছে। বিরোধী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করছে; এমনকি সরকারের প্রথম ছয় মাসের ব্যবস্থাপনা নিয়েও তারা কঠোর সমালোচনা করেছে। সংসদেও বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ইস্যুতে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা গেছে। এই মতবিরোধ গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো— রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি এমন পর্যায়ে যাবে, যেখানে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হবে? সরকারের ব্যর্থতা থাকলে তার জবাবদিহি চাইতে হবে। অনিয়ম থাকলে তদন্ত করতে হবে। দুর্নীতি থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুল নীতি থাকলে বিকল্প নীতি দিতে হবে। জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরিবহন অচল হলে দিনমজুর ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজারে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়ে। বিনিয়োগকারীর আস্থা কমলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। আর দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পুরো অর্থনীতি তার মূল্য দেয়। এ কারণে সরকার ও বিরোধী— উভয় পক্ষের কাছেই এখন দায়িত্বশীল রাজনীতি প্রত্যাশিত। সরকারের দায়িত্ব হলো বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে না দেখা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা করা এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি ও তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব হলো সংসদ ও রাজপথ— দুই জায়গাতেই দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতির চর্চা করা। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার প্রমাণ দিতে হবে, বিকল্প নীতি দিতে হবে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো রাজনৈতিক দলই যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না করে যার সুযোগ নেয় অগণতান্ত্রিক শক্তি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই— রাজনৈতিক শূন্যতা কখনও শূন্য থাকে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে অন্য শক্তি সেই জায়গা দখল করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তার মূল্য দেয় জনগণ। রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি তার শিকার হয়। তাই এখন প্রয়োজন 'কে ক্ষমতায় থাকবে'— এ প্রশ্নের পাশাপাশি 'রাষ্ট্র কীভাবে ভালোভাবে চলবে'— এ প্রশ্নকে সামনে আনা। নতুন সরকারকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু ক্ষমতায় আসেনি, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও প্রস্তুত। আর বিরোধী দলগুলোকেও প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু সরকারবিরোধী নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে কার্যকর বিকল্প শক্তি। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনেক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা ফলাফল দেখতে চায়। সাত মাসে কোনো সরকার সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না— এটি বাস্তবতা। কিন্তু সাত মাসের মধ্যেই সরকারের অগ্রাধিকার, দিকনির্দেশনা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কিছুটা প্রতিফলন দেখা সম্ভব। একইভাবে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক পরিপক্বতাও তাদের কর্মসূচি ও আচরণে প্রকাশ পাবে। এখন তাই সরকারকে অযথা অস্থিতিশীল করার রাজনীতি নয়, সরকারের প্রতিটি কাজের কঠোর কিন্তু তথ্যভিত্তিক জবাবদিহি দরকার। সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন যেমন গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়, তেমনি অন্ধ বিরোধিতাও দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন— রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অচলাবস্থার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তব অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। দীর্ঘ সংকটের পর যে গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করবে সময় এবং জনগণ। সেই বিচারের আগে সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, আবার কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো দল নয়— বাংলাদেশই সবচেয়ে বড়।

লেখক ও সিনিয়র সাংবাদিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত