ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্ব শিশু হাড় ও জয়েন্ট দিবস

শিশুর হাড়-জোড়ার সুস্থতায় চাই সচেতনতা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
শিশুর হাড়-জোড়ার সুস্থতায় চাই সচেতনতা

শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাঁটাচলা ও খেলাধুলার জন্য হাড়, জয়েন্ট ও পেশির সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মগত ত্রুটি, অপুষ্টি, সংক্রমণ, আঘাত কিংবা বিভিন্ন রোগের কারণে শিশুদের এসব অঙ্গে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। প্রতি বছর ১৯ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব শিশু হাড় ও জয়েন্ট দিবস। শিশুদের অস্থি-পেশিতন্ত্রের রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।

শিশুদের হাড় ও জয়েন্টের সমস্যার কারণ : শিশুদের হাড়, জয়েন্ট, পেশি ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গের রোগ, আঘাত কিংবা বিকাশজনিত অস্বাভাবিকতাকে অস্থি-পেশিতন্ত্রের সমস্যা বলা হয়।

পুষ্টির ঘাটতি : ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অভাবে হাড় দুর্বল হতে পারে। ভিটামিন ডির ঘাটতিতে রিকেটস রোগ হয়ে হাড় নরম ও পা বাঁকা হতে পারে।

জন্মগত ত্রুটি : হিপ জয়েন্টের অস্বাভাবিকতা ও ক্লাবফুটের মতো সমস্যা জন্মের সময় থেকেই থাকতে পারে।

সংক্রমণ : অস্টিওমাইলাইটিস (হাড়ের সংক্রমণ) ও সেপটিক আর্থ্রাইটিস (জয়েন্টের সংক্রমণ) দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন এমন গুরুতর রোগ।

আঘাত : খেলাধুলা, পড়ে যাওয়া ও দুর্ঘটনায় হাড় ভাঙা বা জয়েন্টে আঘাত লাগতে পারে।

প্রদাহজনিত ও অন্যান্য রোগ : জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস, জেনেটিক সমস্যা এবং হরমোনজনিত অসুস্থতা হাড় ও জয়েন্টের স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

লক্ষণ ও জটিলতা : শিশুর হাঁটতে গিয়ে খুঁড়িয়ে চলা, হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব, লালচে ভাব, সকালে জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা, হাত-পা নাড়াতে অসুবিধা কিংবা স্বাভাবিক খেলাধুলায় অনীহা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। বয়স অনুযায়ী হাঁটতে শেখায় বিলম্ব বা পায়ের গঠনে অস্বাভাবিকতাও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ।

সব ব্যথাকে বাড়ন্ত বয়সের ব্যথা মনে করা ঠিক নয়। জ্বরের সঙ্গে জয়েন্টে ব্যথা, আক্রান্ত অঙ্গে ভর দিতে না পারা, তীব্র ব্যথা কিংবা আঘাতের পর অঙ্গ বিকৃত দেখালে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসা না হলে হাড়ের স্থায়ী বিকৃতি, পায়ের দৈর্ঘ্যে পার্থক্য, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হাঁটাচলায় সমস্যা ও জয়েন্টের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। হাড়ের বৃদ্ধির অংশে গুরুতর আঘাত ভবিষ্যৎ বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা : চিকিৎসক শিশুর জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস, পুষ্টি, পারিবারিক ইতিহাস এবং শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা, ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা নির্ণয়, আলট্রাসনোগ্রাফি কিংবা এমআরআই প্রয়োজন হতে পারে। সব শিশুর সব পরীক্ষা দরকার হয় না।

রিকেটস, জন্মগত হিপ ডিসপ্লাসিয়া, ক্লাবফুট, হাড় ভাঙা, জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস এবং হাড় ও জয়েন্টের সংক্রমণে রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। সংক্রমণ সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

হোমিওপ্যাথিসহ কোনো বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা শিশুদের এসব রোগ নিরাময়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

প্রতিরোধে করণীয় : বয়স অনুযায়ী দুধ, দই, ডিম, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়াতে হবে। নিরাপদে বাইরে খেলাধুলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে সম্পূরক গ্রহণ উপকারী। নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়াম দেওয়া উচিত নয়। বয়স উপযোগী শারীরিক কার্যক্রম হাড় ও পেশির বিকাশে সহায়তা করে। নিরাপদ খেলার পরিবেশ, উপযুক্ত জুতা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। শিশুর ঘুম, বৃদ্ধি, হাঁটাচলা ও শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আঘাত পেলে আক্রান্ত অঙ্গ নাড়াচাড়া কমিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। হাড় ভাঙার সন্দেহ হলে জোর করে সোজা করা বা মালিশ করা যাবে না।

সচেতনতাই সুরক্ষার প্রথম ধাপ : শিশুর হাড় ও জয়েন্টের সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। ব্যথা, ফোলাভাব, খুঁড়িয়ে হাঁটা কিংবা বিকাশে অস্বাভাবিকতা অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সুষম পুষ্টি, নিরাপদ খেলাধুলা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত