ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস

আজও অধরা নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
আজও অধরা নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন

প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও বহু তাজাপ্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন আজ যেন এক সুদূরপরাহত মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে আমাদের এ চরম বাস্তবতা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত এক দশকে সড়কে নিহতের সংখ্যা প্রায় আশি হাজারে পৌঁছেছে। এ উপাত্ত অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার দেওয়া তথ্যটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং উদাসীনতাকে জাতির সামনে উন্মোচিত করে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় তিন লাখ সাধারণ মানুষ।

এ সংগঠনের মহাসচিবের দেওয়া তথ্য মতে, আহতদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ বিপুল পরিমাণ আহতের সংখ্যা আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করছে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী, জিডিপির প্রায় দুই-শতাংশ অর্থ প্রতিবছর সড়কের এ অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ২৫ হাজার মানুষ নিহত হন। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার উপাত্ত সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ অনেক দুর্ঘটনাই শেষ পর্যন্ত নথিভুক্ত হয় না। ডব্লিউএইচওর এ বৈশ্বিক রিপোর্টটি বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার নাজুক পরিস্থিতি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে প্রায় ২৫ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের এ দাপ্তরিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, মহাসড়কগুলোতেই সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত তদারকির অভাব এবং চালকদের বেপরোয়া গতিকে এর জন্য প্রধানত দায়ী করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, প্রতিদিন গড়ে ৮০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী এখানে ভর্তি হন।

এ সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসকদের তথ্য মতে, ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশই তরুণ এবং কর্মক্ষম যুবক। পঙ্গুত্বের এ ক্রমবর্ধমান হার দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের এক সামাজিক জরিপে জানা গেছে যে, গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশই শিশু। এ আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, বিদ্যালয়গামী শিশুরা রাস্তা পারাপারের সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। নিরাপদ ফুটপাত এবং জেব্রা ক্রসিংয়ের অনুপস্থিতি শিশুদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, দেশে প্রায় ১০ লাখ ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করছে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কারণে প্রায় ২৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অবৈধ ও লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক বিশেষ তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং এটি এক ধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। নিরাপদ সড়কের অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে এ রিপোর্টে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের এক নগর পরিকল্পনা-সংক্রান্ত গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ঢাকার সড়কগুলোর মাত্র পাঁচ-শতাংশ পথচারীবান্ধব। এ পেশাজীবী সংগঠনের উপাত্ত অনুযায়ী, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানসম্মত নগর পরিকল্পনা ছাড়া নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে তারা জানান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির এক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর সত্তর-শতাংশই দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়। এ স্বনামধন্য থিংক ট্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। সামাজিকভাবে এই বিপর্যয় রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিমা সুবিধা চালু করা দরকার।

ক্রমবর্ধমান হারে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে অসংখ্য নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ডানা বেঁধেছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এ বিশেষ দিনে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এ শোকাতুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগঠিত উপায়ে নিরাপদ সড়ক চাই নামক সামাজিক আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল।

বিগত ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজধানীসহ সারা দেশের রাস্তাঘাটে নেমে এসে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছিল। এ ঐতিহাসিক আন্দোলন দেশের সড়ক নিরাপত্তা আইন সংস্কারের পথকে সুগম করেছিল।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের শেষভাগে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবারও নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সোচ্চার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে এ আন্দোলনে সড়ক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার জোর দাবি জানানো হয়। শিক্ষার্থীদের এ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, নিরাপদ সড়কের আকাঙ্ক্ষা তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে প্রোথিত রয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিভিন্ন সময়ে চালকদের অধিকার ও প্রশিক্ষণের দাবিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে। এ শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উদ্যোগে চালকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন করা হয়। চালকদের সঠিক মানসিক সুস্থতা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন দেশের সড়ক খাতে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধন ও নাগরিক সমাবেশ আয়োজন করেছে। এই সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মতে, সড়কের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার মূল উৎস। দুর্নীতিমুক্ত পরিবহন খাত গড়ে তোলার জন্য তারা প্রতিনিয়ত আন্দোলন ও ওয়াকালতি করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বা বাপা পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। এ পরিবেশবাদী সংগঠনের মতে, অতিরিক্ত যানবাহন এবং অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের জীবনকেও বিপন্ন করছে। তারা নিরাপদ ফুটপাত নির্মাণ এবং গণপরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে বহু বছর। এ জটিল সমস্যা সমাধানে প্রথম করণীয় হলো বিআরটিএর মাধ্যমে চালকদের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আধুনিকায়ন করা। চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অদক্ষ ও ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের রাস্তা থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের সব মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে স্বয়ংক্রিয় গতিমাপক ক্যামেরা এবং আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং গতিসীমা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো থেকে বিরত রাখবে।

তৃতীয় করণীয় হলো— দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোর নকশাগত ত্রুটি দ্রুত দূর করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করা। ফুটপাত হকারমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করতে হবে এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে পথচারী নিহতের হার অনেক কমে আসবে, নিশ্চিতভাবেই।

চতুর্থত, গণপরিবহন খাতের আমূল সংস্কার করে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসসেবা চালু করতে হবে এবং যত্রতত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একা সরকারের পক্ষে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখানে অত্যন্ত জরুরি। ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যত্রতত্র রাস্তা পারাপার বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমেই শুধু আজও অধরা নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে পারে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত