প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
রপ্তানি আয় বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ শক্তিশালী করা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন বাজার অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তন কিংবা বাণিজ্যনীতিতে আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব এড়াতে এই নির্ভরতা কমানো জরুরি। এ বাস্তবতায় দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে বাংলাদেশ প্রায় ১৯ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিল, চিলি ও পেরু প্রধান গন্তব্য। বিশেষ করে ব্রাজিল ও চিলিতে রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এই বাজারগুলোতে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে শুধু রপ্তানির বর্তমান পরিমাণ দিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না; দীর্ঘমেয়াদে বাজার ধরে রাখা ও সম্প্রসারণের কার্যকর কৌশল নিতে হবে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই তৈরি পোশাক থেকে আসছে। অর্থাৎ নতুন ভৌগোলিক বাজারে প্রবেশ করলেও পণ্য বৈচিত্রের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন। কোনো একটি পণ্যশ্রেণির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রপ্তানি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। তাই তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী, জুতা, ওষুধ, হস্তশিল্প, গৃহসজ্জার উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে।
ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত 'হোম শো ব্রাজিল ২০২৬' প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের চারটি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ। পাট, চামড়া, বাঁশ, টেরাকোটা ও নকশিকাঁথার মতো পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্য, দক্ষতা ও উৎপাদন সক্ষমতা পরিচিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রদর্শনী-পরবর্তী ব্যবসায়িক যোগাযোগ কতটা কার্যকরভাবে রপ্তানি আদেশে রূপান্তরিত হয়, তার ওপর।
এ জন্য দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর ভোক্তাদের পছন্দ, বাজারের আকার, আমদানি শুল্ক, পণ্যের মান, প্রতিযোগী দেশের অবস্থান এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় আমদানিকারক ও পরিবেশকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি পণ্যের মান, নকশা, প্যাকেজিং এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাজার উপযোগী বিপণন কৌশলও গ্রহণ করা জরুরি।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। ইপিবি ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে সম্ভাব্য ক্রেতাদের তথ্য সংগ্রহ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপন এবং বাজার প্রবেশের বাধা দূর করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং রপ্তানি অর্থায়নেও সহায়তা দেওয়া দরকার।
দক্ষিণ আমেরিকার বাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিকল্পনা, পণ্য বৈচিত্র, বাজার গবেষণা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা। শুধু নতুন দেশে পণ্য পাঠানো নয়, বরং সেখানে বাংলাদেশের পণ্যের স্থায়ী চাহিদা তৈরি করাই হওয়া উচিত রপ্তানি সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য।