ঢাকা রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যুদ্ধের বিভীষিকা নয়, চাই শান্তির পৃথিবী

রেজাউল করিম খোকন
যুদ্ধের বিভীষিকা নয়, চাই শান্তির পৃথিবী

এ পৃথিবীর ইতিহাসে দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ইতিমধ্যেই। যার ভয়ঙ্কর প্রভাবের কথা মনে হলে শিউরে উঠে মন। চরম বিভীষিকাময় সেই যুদ্ধের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। বিশ শতকের দুটি বিশ্বযুদ্ধ (প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা বিশ্বজুড়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক দীর্ঘস্থায়ী ও প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ২ কোটি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষ নিহত হয়, যার একটি বড় অংশই ছিল সাধারণ বেসামরিক নাগরিক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি কর্তৃক প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলায় মুহূর্তের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর অবকাঠামো, কলকারখানা, এবং কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধের পর ইউরোপ এবং এশিয়ার বিশাল অংশ জুড়ে তীব্র খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যুদ্ধরত দেশগুলো চরম অর্থনৈতিক মন্দা এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে উসমানীয় (অটোমান), রুশ, জার্মান এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন— এ দুটি পরাশক্তিতে বিভক্ত হয়ে শীতল যুদ্ধে রূপ নেয়। বহু নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং জার্মানি ও কোরিয়ার মতো দেশগুলো বিভক্ত হয়ে যায়।

যুদ্ধে একটি বিশাল তরুণ প্রজন্ম প্রাণ হারানোয় সমাজ দীর্ঘকাল জনশক্তি ও মেধার শূন্যতায় ভুগেছে। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা লাখ লাখ সৈনিক এবং সাধারণ মানুষ 'শেল শক' বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয়। হালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে আবার। পৃথিবীর কয়েকটি দেশের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। ইরানের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে হঠাৎ করেই পারমাণবিক হামলার পরিস্থিতিতে নাগরিকদের করণীয় বিষয়ে পাঁচটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে। সম্ভাব্য পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় ও পরবর্তী সময়ে কীভাবে প্রাণ রক্ষা করতে হবে, তা জানিয়ে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অতি সম্প্রতি প্রচারিত নির্দেশনায় বিস্ফোরণের মুহূর্তে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়া থেকে শুরু করে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শ এড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।প্রথম নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের আলো বা আগুনের গোলার দিকে সরাসরি তাকানো যাবে না। বিস্ফোরণের সময় দ্রুত শক্ত কোনো কিছুর আড়ালে আশ্রয় নিতে হবে এবং বিস্ফোরণের অভিঘাতের তরঙ্গ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত নিচু হয়ে থাকতে হবে।

দ্বিতীয় নির্দেশনায় বিস্ফোরণের তরঙ্গ থেমে যাওয়ার পরপরই কাছের কোনো ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ সময় জানালা ও ভবনের বাইরের দেয়াল থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে অবস্থান করা, ছবি তোলা কিংবা গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথাও বলা হয়েছে। তৃতীয় নির্দেশনায় তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকলে শরীরের খোলা অংশ পরিষ্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য কুসুম গরম পানি ও সাবান দিয়ে গোসল করতে হবে। ব্যবহার করতে হবে কন্ডিশনারবিহীন সাধারণ শ্যাম্পু। গোসলের সুযোগ না থাকলে অন্তত মুখ, হাতসহ শরীরের উন্মুক্ত অংশ পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

চতুর্থ নির্দেশনায় হামলার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা আশ্রয়স্থলের ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এ সময় শুধু বোতলজাত পানি ও প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পঞ্চম নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টা পার হলেই পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। আশ্রয়স্থল থেকে বের হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। তবে আশ্রয় নেওয়া ভবনে আগুন লাগার বা ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে অন্য নিরাপদ ভবনে সরে যেতে হবে। এরকম সতর্কতা অবলম্বনের কথা শুনে যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কোনোভাবেই স্থির হয়ে বসে থাকতে পারবেনা। চরম আতঙ্ক গ্রাস করবে। ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা ভেবে স্বভাবিক জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যেতে পারে। ইরানের সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র পিকঅ্যাক্স পর্বতে মার্কিন পারমাণবিক হামলার শঙ্কা নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরাগী ও সাবেক ফক্স নিউজ সঞ্চালক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ কেন্দ্রে পারমাণবিক হামলার কথা বিবেচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এমন কোনও হামলার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। হামলা চালানো হলে এর তেজস্ক্রিয় প্রভাব ইরান ছাড়িয়ে আবহাওয়া ভেদে পাকিস্তান ও ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ইরানের মধ্যঞ্চলীয় ইস্পাহান প্রদেশে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স পর্বত ভারত থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে। এই কেন্দ্রটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩২৮ ফুট গভীরে অবস্থিত, যা ফোর্দো ও নাতাঞ্জের চেয়েও গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের বাঙ্কার-বাস্টার বোমা মাত্র ৬০ ফুট গভীর পর্যন্ত আঘাত হানতে পারায় এ পর্বত ধ্বংস করতে পারমাণবিক হামলাকেই একমাত্র সামরিক বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অধিকাংশ পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে, তবে এখনও দু-একটি লক্ষ্যবস্তু বাকি। তিনি বলেছেন, আমাদের পিকঅ্যাক্স পর্বতে হামলা চালাতে হতে পারে। আমরা যখনই চাই, এক ঘণ্টার মধ্যে তা করতে পারি। তবে এর আগে নিউজমেক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না, আমাদের তার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ দাবি করছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপে পড়ে ট্রাম্প হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই এই হামলার নির্দেশ দেবেন। এ হামলা পারস্য উপসাগরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেবে এবং রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াকে টেনে এনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে এ দাবির পেছনে কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্যের প্রমাণ মেলেনি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। একজন ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মারিও নাওফালের তৈরি একটি গাণিতিক মডেল অনুয়াযী, এ হামলায় সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় মেঘ বাতাসের গতিপথে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাতাসের দিক ও গতিবেগ অনুযায়ী এটি ভারতের পাঞ্জাব, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর ও গুজরাটেও হালকা মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। বোমার শক্তি ও আবহাওয়ার ওপর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নির্ভর করবে।

পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে সিংহভাগ তেজস্ক্রিয়তা বিস্ফোরণস্থলের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাতাসের কারণে কিছু অংশ পূর্বে পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে গেলেও দূরত্বের কারণে তা অতি সামান্য বা 'ট্রেস লেভেল'-এ নেমে আসবে। যেকোনও পারমাণবিক পদক্ষেপ অবিলম্বে ইরানের জন্য এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে। এর তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ কুয়েত, জর্ডান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পাকিস্তানের দিকে ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি এটি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে কিয়েভে পারমাণবিক হামলা চালানোর জন্য রাশিয়ার পথও খুলে দেবে। ফলে ট্রাম্প যদি এই সিদ্ধান্ত নেন, তবে এটি কেবল স্থানীয় কোনও সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র কখনো পারমাণবিক হামলার মতো চরম পদক্ষেপ নেবে না, কারণ এতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হবে।

ইরান মাত্র ৫০ থেকে ১০০ বর্গমিটারের ছোট পরিসরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা রাখে এবং দেশের ভেতরেই সকল সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ইরান বর্তমানে তার পারমাণবিক নীতির কোনো পরিবর্তন আনছে না, যদি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতিমাত্রায় নির্বোধ এবং গণহত্যাধর্মী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কোনো পরিদর্শক ইরানে প্রবেশ করতে পারছেন না।

এ মুহূর্তে আরেকটি নতুন বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হলে, আমরা কেউই রেহাই পাবোনা। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাবে না কোনো দেশের মানুষ, জনপদ , শিল্প কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ,ধর্মীয় উপাসনালয় , ছবির মত সাজানো গোছানো প্রাকৃতিক শোভা মন্ডিত পর্যটন কেন্দ্র। সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে। মানব সভ্যতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বযুদ্ধ মানেই বিপুল প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবতার চরম বিপর্যয়।

অতীতের দুটি বিশ্বযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, যুদ্ধে আসলে কেউ জেতে না। বরং এতে মানবতার পরাজয় ঘটে, কেবল ধ্বংসের গভীরতা বাড়ে। বর্তমান সময়ে পারমাণবিক যুগে একটি নতুন বিশ্বযুদ্ধ সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই হুমকিস্বরূপ। তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পারস্পরিক আলোচনা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে যেকোনো সংকট সমাধান করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ পুরো মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই যুদ্ধ এড়াতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন, কূটনৈতিক আলোচনা একান্ত জরুরি। যেকোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ বুলেটের বদলে আলোচনার টেবিলে সমাধান করা যায়। এখানে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করা এবং শান্তি বজায় রাখার কাজটি জাতিসংঘ করতে পারে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত