প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
আধুনিক করপোরেট দুনিয়ায় পা রাখলেই আজকাল এক অদ্ভুত অলিখিত নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে ক্লান্তি, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ প্রকাশ করাকে অনেক সময় নেতিবাচক মনোভাব হিসেবে দেখা হয়। অফিসে ঢুকেই মুখে কৃত্রিম হাসি ধরে রাখা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে 'সব ঠিক আছে' বলে নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণের এ প্রবণতাই 'টক্সিক পজিটিভিটি' বা বিষাক্ত ইতিবাচকতা। ইতিবাচক মানসিকতা নিঃসন্দেহে কর্মপরিবেশকে সুন্দর করে তোলে। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে জোর করে ভালো থাকার অভিনয় মানুষের স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মী যখন তার যৌক্তিক উদ্বেগ, ক্লান্তি কিংবা মানসিক চাপ প্রকাশের সুযোগ পান না, তখন তিনি ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ফলে অফিসের ঝকঝকে দেয়ালের আড়ালে গড়ে ওঠে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান— কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
করপোরেট সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত কাজ করা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে উপেক্ষা করাকে অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরা হয়। রাত জেগে কাজ করা কিংবা ছুটির দিনেও ই-মেইলের উত্তর দেওয়াকে 'কাজের প্রতি ভালোবাসা' হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কর্মীরা নিজেদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি আড়াল করতে বাধ্য হন। কারণ, বিশ্রামের প্রয়োজনের কথা বললেই তাদের 'অযোগ্য' কিংবা 'অলস' হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ মানুষের মস্তিষ্ক কোনো যন্ত্র নয়, যা বিরতিহীনভাবে একই গতিতে কাজ করতে পারে।
অবিরাম কাজের চাপ এবং ভালো থাকার কৃত্রিম অভিনয়ের ফলে কর্মীদের মধ্যে বার্নআউট বা কর্মজনিত চরম অবসাদের ঝুঁকি বাড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের মনোযোগ, সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতার ওপর।
মানসিক চাপ লুকিয়ে রাখার এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি দলের সদস্যরা যখন নিজেদের প্রকৃত সমস্যা কিংবা কাজের চাপ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন না, তখন কাজের ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাও আড়ালে থেকে যায়। কোনো প্রকল্পে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হলেও শুধু ইতিবাচক থাকার চাপের কারণে কর্মীরা তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে দ্বিধা করেন। ফলে ছোট সমস্যা একসময় বড় সংকটে রূপ নেয় এবং প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষতির মুখে ফেলে। তা ছাড়া, যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের আবেগ দমন করেন, তাদের মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও ব্যাহত হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কাজের গুণগত মানের ওপর।
সুস্থ ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হলে করপোরেট সংস্কৃতির কৃত্রিম ইতিবাচকতার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ইতিবাচকতা মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সমস্যার বাস্তবতা স্বীকার করে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এমন একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কর্মীরা নির্দ্বিধায় নিজেদের মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও সীমাবদ্ধতার কথা বলতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা প্রয়োজন, মুখে হাসি ধরে রেখে ক্লান্তি আড়াল করা কর্মীর চেয়ে মানসিকভাবে সুস্থ, স্বতঃস্ফূর্ত ও উদ্যমী কর্মী প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বেশি মূল্যবান।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট