ঢাকা শনিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভালোবাসায় সিক্ত খালেদা জিয়া, কবরে মানুষের ঢল

* জিয়ার সমাধিতে নাতনি জাইমাসহ স্বজনদের শ্রদ্ধা * মায়ের দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে গুলশান আজাদ মসজিদে তারেক রহমান * খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া * খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানালেন নব্বইয়ের ছাত্র ঐক্যের নেতারা
ভালোবাসায় সিক্ত খালেদা জিয়া, কবরে মানুষের ঢল

সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছে। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে নেতাকর্মীরা জিয়া উদ্যানে আসছেন। দলের বাইরেও অনেক সাধারণ মানুষ বেগম জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে আসেন। এর আগে গতকাল সকালে খালেদা জিয়ার নাতনি ও তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান ও খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের নিকটাত্মীয়রা কবর জিয়ারত করেন। তখন কিছু সময়ের জন্য জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও পরে উন্মুক্ত করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে আসেন মোখলেছুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমার নেত্রীর কবর জিয়ারত করতে ধানমন্ডি থেকে এসেছি। তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

গেন্ডারিয়া থেকে মুজিবুল হক তার পরিবার নিয়ে জিয়া উদ্যানে এসেছেন। তিনি বলেন, খালেদা কবর জিয়ারত করতে এসেছি।

জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর পাশে সড়কে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস ও মাইক্রোবাস নিয়ে নেতাকর্মীদের আসতে দেখা যায়। তারা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জিয়া উদ্যানে প্রবেশ করেন। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেখানে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যা দায়িত্ব পালন করছেন। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে আসা শাফিউর রহমান সাফি বলেন, নেত্রীর বিদায় জানাবার দিন অফিস থাকায় আসতে পারিনি। গতকালও চেষ্টা করেছিলাম আসার জন্য কিন্তু সুযোগ হয়নি। আজ বন্ধ থাকায় রাতে রওনা হয়েছিলাম। সকালে এসে ঢাকায় পৌঁছেছি। নেত্রীর কবর জিয়ারত করলাম। আল্লাহ উনাকে বেহেস্ত নসিব করুক।

জিয়ার সমাধিতে নাতনি জাইমাসহ স্বজনদের শ্রদ্ধা : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে ফাতেহা পাঠ ও ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তাঁর তিন নাতনিসহ পরিবারের স্বজনরা। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় শেরেবাংলা নগরে খালেদা জিয়ার কবর প্রাঙ্গণে আসেন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। সঙ্গে ছিলেন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান এবং তার দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান। এছাড়া খালেদা জিয়ার মেজ বোন সেলিনা ইসলাম ও তার স্বামী অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম হুইল চেয়ারে বসে কবরের পাশে এসে শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের পরিবারের সদস্য এবং বেগম জিয়ার দীর্ঘদিনের গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও এসেছেন।

শোকাতুর পরিবেশে পরিবারের সদস্যরা এবং খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান দাদির কবরের সামনে ফুলের তোড়া রেখে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় ফাতেহা পাঠ করেন। এ সময় জাইমার পাশে জাহিয়া ও জাফিয়া রহমানও দাদির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুরো সম জুড়ে কবর প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন ও নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছিল।

এ সময় জাতীয়তাবাদী উলামা দলের সদস্যরা সেখানে কোরআন তেলাওয়াত করেন। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কবর প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ওই সময়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের কবর প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরিবারের সদস্যরা স্থান ত্যাগ করার পর সাধারণ মানুষের জন্য সমাধিটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর প্রিয় নেত্রীর সমাধিস্থলে বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করা শোকার্ত নেতাকর্মীদের ঢল নামে।

মায়ের দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে গুলশান আজাদ মসজিদে তারেক রহমান : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়েছেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টায় তিনি রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে উপস্থিত হন।

আসরের নামাজের পর বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনায় এই বিশেষ দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়।

দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে দুপুর থেকেই গুলশান আজাদ মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। এছাড়া দলমত নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনায় এই দোয়ায় শরীক হন। তারেক রহমানের পাশাপাশি মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।

খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বায়তুল মোকাররমে বিশেষ দোয়া : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ শেষে বিশেষ দোয়া পড়া হয়েছে। মুসল্লি ও সাধারণ মানুষজন এই দোয়ায় অংশ নেন। গতকাল শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ শেষে এই দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে শোক প্রকাশ করা হয়। এরপর দোয়ায় খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। আল্লাহপাক যেন তাকে জান্নাতের বাসিন্দা করেন- এ কামনাও করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গতকাল দেশজুড়ে তৃতীয় ও শেষ দিনের মতো রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ৩১ ডিসেম্বর বুধবার থেকে ২ জানুয়ারি শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। শোকের শেষ দিন গতকালও দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানালেন নব্বইয়ের ছাত্র ঐক্যের নেতারা : খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা। গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টায় নব্বইয়ের ডাকসুর ভিপি ও সেই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের নেতত্বে নেতারা শেরে বাংলা নগরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতাদের মধ্যে হাবিবুর রহমান হাবিব, জহির উদ্দিন স্বপন, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, খন্দকার লুৎফর রহমান, নাজমুল হক প্রধান, মীর সরাফত আলী সপু প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘আমরা নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাএ ঐক্যের নেতারা আজকে এখানে দেশনেত্রী আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। তার কবরে পুস্পস্তবক অর্পণ করেছি। তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেছি।’

আমান বলেন, ‘স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার যে আন্তরিকতা সেটা আজকে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ১৬ বছর শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, প্রহসনের বিচারে তাকে জেলে পাঠিয়েছে, জেলে নির্যাতন করা হয়েছে, ন্যূনতম চিকিৎসা তাঁকে দেওয়া হয়নি।

তাঁকে স্লো পয়েজিংয়ে মাধ্যমে হত্যার অপচেষ্টা করা হয়েছিল, সেই নির্যাতনের দায় আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা কখনো এড়াতে পারবে না। অবশ্যই শেখ হাসিনাকে জবাব দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আজকে কী প্রমাণ হয়েছে? তাঁর জানাজায় যে- কোটি মানুষের উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন স্বাথীনতাণ্ডসার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন মাদার অব ডেমোক্রেসি, গণতন্ত্রের মা।’

আমান বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, আমার ঠিকানা বাংলাদেশ, আমি বিদেশে যাব না। বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। যার জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমানকে কীভাবে নির্যাতন করেছে তা আপনারা জানেন। তাকে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে।

আজকে উনি দেশে ফিরেছেন দেখেছেন কী অভূতপূর্ব সাড়া জেগেছে জনগণের মধ্যে, জনগণ তাকে বরণে করেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।’ উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন বেগম খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়। নেত্রীর মৃত্যুতে বিএনপি বর্তমানে সাত দিনের শোক পালন করছে। এছাড়া সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াণে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে এবং তার স্মরণে দেশজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দোয়া ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত