
জাতিসংঘের অধীন শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে দুইদফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেন তারা। তাদের অবরোধে শাহবাগ মোড়ে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে জাতীয় জাদুঘরের পাশের একটা অংশ দিয়ে যান চলাচল করতে পারছে। সেখানে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল বিকাল ৪টার দিকে মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে যমুনা অভিমুখে রওনা হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে তাদের। এতে সংগঠনের সদস্য সচিব সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরসহ কয়েকজন আহত হন। তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও হত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাত্রা করার সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এতে সংগঠনটির অন্তত ২৩ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে শাহবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা অভিমুখে যেতে চাইলে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের বাধা দেয় পুলিশ। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে। আহতরা হলেন- আম্মার, আব্দুল্লাহ আল জাবের, ঝুমা, মনির, ফয়সাল, জয়, জুলকার, মোশাররফ, নিলয়, অনিক, উমর, রাহাত, রাসেল, আহাদ, মাহিন, আজাদ, শামিম, সোহেল, শাওন, জাবেদ, ঝুমা, আম্মাদ এবং শামিম। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। ঢামেকের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ইমরান হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত ২০-২৫ জন এসেছে। তাদের সবাই আহত। তবে, গুলিবিদ্ধ বা রাবার বুলেটে বিদ্ধ কেউ এসেছে কি না, সেটা এখনই বলতে পারব না। ভর্তি ছাড়াই অনেককে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে জাতিসংঘের অধীন ওসমান হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দুই ভাগে ভাগ হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা- কর্মীরা। এ জন্য ইন্টারকন্টিনাল মোড়ের সামনে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল পুলিশ।
শুক্রবার যমুনার সামনে অবস্থান করছিলেন ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পাসহ কয়েকজন আর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েক শ বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। একপর্যায়ে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ কয়েকজন যমুনার সামনে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থাকা ইনকিলাব মঞ্চের লোকজন ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার দিকে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ প্রথমে তাদের ওপর জলকামান থেকে পানি ছোড়ে। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা- কর্মীরা পুলিশের দিকে বোতল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেন। এ সময় বিক্ষোভকারী ব্যক্তিদের একটি অংশ জলকামানের ওপর উঠে সেটার ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। এ অবস্থায় জনস্বার্থে পুলিশ অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয়। সংঘর্ষের পর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আসেন ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচন ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তখন তিনিসহ উপস্থিত লোকজন প্রতিবাদ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থেকে শাহবাগ মোড়ের দিকে চলে যায়।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা এক ব্যক্তি।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর ওই রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।