
বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দল নির্বাচনের আগে স্বাক্ষর করলেও জুলাই জাতীয় সনদে নতুন সরকার গঠনের একদিন আগে স্বাক্ষর করল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ ঘটনায় তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে এনসিপির পক্ষে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন।
এসময় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি প্রফেসর আলী রীয়াজ, কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
নতুন সংসদ সদস্যদের সামনের দিনগুলো শুভ হোক- প্রধান উপদেষ্টা : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নতুন সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে মঙ্গলবার। সবার সামনের দিনগুলো শুভ হোক। সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই জাতীয় সনদে সই অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। রাতে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এ দলিল যেন নতুন বাংলাদেশকে মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে প্রতিটি পদে পদক্ষেপ রাখে তার জন্য প্রতি মুহূর্তে সচেতন থাকতে হবে। আগামীকাল নতুন সংসদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। সবার সামনের দিনগুলো শুভ হোক। তিনি বলেন, এনসিপি জুলাই সনদে সই করবে বলেই জাতির বিশ্বাস ছিল, আজকে সেই বিশ্বাস পূর্ণতা পেলো। জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণতা পেলো। এ মহতি কাজে অংশ নেওয়ার জন্য এনসিপিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
জুলাই সনদে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখছি না- নাহিদ : নতুন সরকার গঠনের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন না জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সরকার গঠনের আগের দিন সোমবার জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে এনসিপি নেতা এ কথা বলেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নাহিদ ইসলাম।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সংশয় দেখছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না বাস্তবায়ন নিয়ে আর কোনো সংশয় আমরা দেখছি না। কারণ এই নির্বাচনের ভিত্তিটাই হচ্ছে গণভোট এবং গণভোটের ভিত্তি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ। এই আদেশ ছাড়া এই নির্বাচন সম্ভব হত না এই সময়ে এই সরকারের অধীনে। ফলে যদি আমরা নেক্সট পার্লামেন্টকে কার্যকর করতে চাই, নেক্সট গভার্নমেন্টকে কার্যকর করতে চাই, তার বৈধতা হচ্ছে এই গণভোট এবং আদেশ। ফলে সেই আদেশকে মানতে হলে অবশ্যই আপনাকে গণভোটের যে গণরায় এসেছে সেই রায়কে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এনসিপির পক্ষে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন।
এ বিষয়ে নাহিদ বলেন, নোট অব ডিসেন্টের মীমাংসা গণভোটের মাধ্যমে হয়ে গিয়েছে। গণভোটের আদেশ এবং গণভোটের প্রশ্নগুলো সেখানে কিন্তু স্পষ্টভাবেই আছে কোন সংস্কারগুলো দলগুলো তাদের ইশতেহার অনুযায়ী করবে। কোন সংস্কারগুলো সবাই ঐক্যমত হয়েছে সেটা অটোমেটিক হয়ে যাবে। আবার কিছু সংস্কার বাধ্যতামূলক জনগণের রায়ের ওপর এটা নির্ভর করছে, যেমন উচ্চকক্ষ ভোটের অনুপাতে হবে, নির্বাচন কমিশনার সবাই মিলে যে নিয়োগ করবে এই বিষয়গুলো। ফলে গণভোটের যে প্রশ্ন–এর মধ্য দিয়ে আসলে নোট অব ডিসেন্টের পুরো বিষয়টিই মীমাংসিত হয়ে গেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা এবং সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি করে দেয়, তা কাজে লাগাতে ২০২৪ সালের শেষে জুলাই সনদ করার দাবি তুলেছিলেন জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা।
নাহিদ বলেন, জুলাই সনদে সবার শেষে স্বাক্ষর করলেও এই সনদ বাস্তবায়নের জন?্য আমরা ছিলাম সর্বোচ্চ তৎপর। যে সময়টায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটা শুধু কেবল একটি ডকুমেন্ট ছিল। এটার কোন আইনি ভিত্তি ছিল না। আমরা তো পরিষ্কার বলেছি, আমরা একটা আইনি ভিত্তি চাই। ফলে এর পরে যখন আইনি ভিত্তি দেওয়া হল, গণভোট আদেশের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ আদেশের মাধ্যমে, সে আদেশ এটার আইনি ভিত্তি দিয়েছে এবং এর পরবর্তীতে গণভোট হয়েছে গণরায় প্রতিফলিত হয়েছে। এখন আমাদের আমরা মনে করছি যে যেহেতু এটার একটা আইনি ভিত্তি পেয়েছে, গণরায়ও চলে এসেছে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই জুলাই জাতীয় সনদ করতে চেয়েছিলাম, সেটা সফল হয়েছে।’
নাহিদ বলেন, ‘এখন এটা আমাদের বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের দ্বিধা না থাকে–যে একটা পার্টি কেন সই করে নাই, সেটা যাতে না হয়। এই বাস্তবায়নের স্বার্থে আমরা স্বাক্ষরটি করছি।’ জুলাই সনদে এখন এনসিপির স্বাক্ষর করাটা ‘অনুষ্ঠানিকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তো গণভোটের পক্ষে, ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা করেছি, পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমরা স্বাক্ষর না করলেও হয়ত কিছু হত না। কিন্তু স্বাক্ষরটা আমরা করলাম যেহেতু একটা আনুষ্ঠানিকতা... এই অন্তর্বর্তী সরকার, ঐক্যমত কমিশন, তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটা হয়েছে, পুরো বিষয়টাকে একটা পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষে আমরা স্বাক্ষর করেছি।’
নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হচ্ছে- সে বিষয়টি তুলে ধরে নাহিদ বলেন, ‘গণপরিষদের জায়গা থেকে সংস্কার পরিষদে যখন এসেছে, তখন আমরা এটাকে মেনে নিয়েছি। যেহেতু অন্যান্য দল এবং একটা ঐকমত্যের স্বার্থে আমরা মনে করছি যে, সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নিয়েই আমাদের এই সময়টাতে আগাতে হবে; এই অর্জনটুকু নিয়ে আমাদের সামনের দিকে আগাতে হবে।’ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ সাত মাস ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। সেদিন ২৪টি দল সনদে সই করে, পরে আরও একটি দল সই করেছে। তবে এনসিপি জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যায়নি, পরেও আর সনদে সই করেনি। তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগের দিন ১৬ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর না করলে পরবর্তী সময়ে সই করার সুযোগ থাকবে।