ঢাকা রোববার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

জেনেভায় দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক আলোচনা শুরুর দিনই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি মন্তব্য করেছেন- পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেওয়া’ সম্ভব। তেহরানে এক অনুষ্ঠানে খামেনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী’ বলে দাবি করেছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা বলছে। যুদ্ধজাহাজ নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক- তবে এমন অস্ত্রও রয়েছে, যা সেই জাহাজকে সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দিতে পারে।

সংবাদ মাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে খামেনির এ মন্তব্য এসেছে। ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমানবাহী রণতরী ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ওই অঞ্চলের উদ্দেশে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, কোনো চুক্তি না হলে এ রণতরী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে এবং এটি শিগগিরই রওনা দেবে।

মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’ এবং কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার ইতোমধ্যেই পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে গত মাসে সেগুলো পাঠানো হয়। চলমান আলোচনার বিষয়ে খামেনি বলেন, আলোচনা চলার সময় আগেভাগে এর ফল নির্ধারণ করে নেওয়া ‘ভুল এবং বোকামি।’

মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা মঙ্গলবার জেনেভায় শুরু হয়েছে। এর আগে প্রায় আট মাস বন্ধ থাকার পর চলতি মাসের শুরুতে মাসকাটে উভয় পক্ষ আবার কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে যুদ্ধের আশঙ্কা এখনো পুরোপুরি কাটেনি- এমন পরিস্থিতিতেই আলোচনা চলছে। রোববার এক বক্তব্যে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আবদোল রহিম মুসাভি সতর্ক করে বলেন, দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য ‘একটি শিক্ষা’ হয়ে দাঁড়াবে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান : পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালীন এক বিরল শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার জেনেভায় ওমানি দূতের বাসভবনে যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তেহরান এই ঘোষণা দেয়।

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সামরিক মহড়া এবং নৌ-নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েক ঘণ্টার জন্য এই প্রণালি বন্ধ রাখা হয়েছে। এ মহড়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী লাইভ মিসাইল বা তাজা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮০-র দশকের পর এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করার এমন ঘোষণা দিল। এ সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীও মাঝে মাঝে এমন চড় খেতে পারে যে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যুদ্ধজাহাজের চেয়েও বড় বিপদ হলো সেই অস্ত্র যা জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে। তবে সামরিক এই মারমুখী অবস্থানের বিপরীতে ভিন্ন সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির কণ্ঠে। জেনেভায় জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর জন্য একটি নতুন জানালা উন্মোচিত হয়েছে। তিনি এই আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যে কোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত। এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, আলোচনা কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক হয়েছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছু ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা ইরান এখনো মেনে নিতে রাজি নয়। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে ওই অঞ্চলে আগে থেকেই অবস্থান করা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে এই বিশাল সামরিক বহর। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হলেও, আলোচনার খবর আসার পর দাম কিছুটা কমেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরান যে বিস্তারিত প্রস্তাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা এই দীর্ঘদিনের পারমাণবিক অচলাবস্থা নিরসনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত