ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মোমিন জীবনে কর্মপরিকল্পনার গুরুত্ব

মোমিন জীবনে কর্মপরিকল্পনার গুরুত্ব

রমজান এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে আমাদের নিজেদের সংশোধন করার অবারিত সুযোগ। রমজানে সবচে‘ যে বিষয়টির পরিচর্যা হয়, তা হল ইচ্ছাশক্তির ক্ষমতায়ন। আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যেকের চিন্তা। মাথায় যে চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত আসে সেটি বাস্তবায়নের জন্য আমরা উদ্যোগী হই, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করি। তার ভিত্তিতে আমাদের জীবন সমাজ সংসার ও পুরো বিশ্বব্যবস্থা পরিচালিত হয়। চিন্তার এই শক্তিমত্তার পেছনে নিয়ন্ত্রক কে তাকি আমরা চিন্তা করেছি? সেই নিয়ন্ত্রক, নিয়ামক হচ্ছে আমাদের ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। আমরা যখন কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা পোষণ করি, তখন মনের ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হয়, রূহ বা আত্মা সহযোগিতার হাত বাড়ায়, তখন বাইরের দুনিয়ার ফেরেশতারা আমাদের সহযোগী হয়ে যায়। আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফিক বা সামর্থ্যরে হাতছানি এসে কাজটির সুসম্পাদন করে।

আমরা যদি ভালোর পরিবর্তে খারাপ বা মন্দ কাজের ইচ্ছা করি তখন মনের মাঝে ওঁত পেতে থাকা নফস বা কুপ্রবৃত্তি তৎপর হয়ে উঠে, সাথে সাথে বাইরের দুনিয়ার শয়তানরা সহযোগিতার হাত বাড়ায়, এখানেও আল্লাহর পক্ষ হতে সামর্থ্য এসে বলে, আমি তোমার ইচ্ছা কার্যকরি করার পথে বাধা দেব না, তবে এর দায় নিতে হবে তোমার নিজেকে। এভাবে মানব জীবনের প্রতিটি কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যেকের ইচ্ছাশক্তি।

পবিত্র রমজান মাস আসে মানব মনের এই অপ্রতিরোধ্য নিয়ন্ত্রক ইচ্ছাশক্তিকে বলিয়ান করার জন্য। এই সাধনা ও অনুশীলন চলে পুরো রমজান মাসে প্রতিটি মুহূর্তে। যে কোনো প্রাণির জীবনকে তাড়িত ও উদ্দীপিত করে দু‘টি জিনিস। একটি পেটের ক্ষুধা আরেকটি যৌন ক্ষুধা। এই দু‘টি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি যার যত বেশি মানুষ হিসেবে তিনি তত সবল ও সফল।

ইচ্ছাশক্তিকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় নিয়ত। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, ‘ইন্নামাল আমালু বন্নিয়্যাত’=“সকল কাজের শুদ্ধতা ও ফলাফল নিয়ত বা সংকল্পের উপর নির্ভর করে।” আমার কাজের সুফল বা সওয়াব কতখানি পাব তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমার নিয়তের উপর।

প্রত্যুষে পূর্বাকাশে ভোরের আলোর রেখা ফুটে ওঠার আগেই সেহরী খেয়ে রোজার নিয়ত করতে হয়। তারপর সারাদিন কোনো খাবার বা পানীয় কিংবা যৌন সংসর্গ করতে পারে না রোজাদার। তা না হলে রোজা বাতিল হয়ে যাবে। এই যে সারাদিন খানাপিনা বা যৌন সংসর্র্গ থেকে বিরত থাকার সাধনা, তা মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে বিরাটভাবে বলিয়ান করে।

হয়ত বলতে পারেন, রোজা রাখার ফলে কী সওয়াব পাওয়া গেল আমরা তো চোখে দেখি না। কিন্তু অন্তরের দৃষ্টিতে তাকালে সেই সওয়াবের সুফল দেখা যায়। রমজানের সাধনার মাধ্যমে যদি আমার মধ্যে ভালো চিন্তা ও কাজের উদ্ভব হয়, মন্দকে পরিহার করতে সমর্থ হয়, তাহলে সেটিই তার জন্য নগদ সওয়াব। মনে করুন, ধূমপান র্জদা খাওয়ার বদণ্ডঅভ্যাস। রমজানের বদৌলতে দিনে পরিহার করার সাথে সাথে যদি আমরা ইচ্ছাশক্তিকে বলিয়ান করি এবং রমজানে রাতের বেলাও এসব থেকে দূরে থাকি আর রমজানের পরে সেই বদ অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারি তাহলে বুঝতে হবে, রমজানের সওয়াব, আধ্যাত্মিক উপহার আমি পেয়ে গেছি।

কোন অভ্যাস বা কাজটি আমার জীবনের জন্য ক্ষতিকর বা কোন পদক্ষেপটি আমার জীবনকে সুন্দর ও সফল করবে। এরপর যদি সেই কাজটি করার বা বর্জন করার মন স্থির করি তাতেও বিরাট সওয়াব। নবী করিম (সা) যখন মে‘রাজে গিয়েছিলেন তখন আল্লাহর পক্ষ হতে কয়েকটি উপহার দেয়া হয়, তন্মধ্যে একটি আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে আমূল পরিবর্তন ও বিপ্লব এনে দেয়। সেটি হল ভালো কাজের চিন্তা, সংকল্প ও সিদ্ধান্ত। যে কোনো ভালো কাজ যদি করার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করি আর সেই ইচ্ছা মনের জমিনে লালন ও পরিচর্যা করি তাতে কাজটি করতে না পারলেও সওয়াব পাওয়া যাবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসটি এ ক্ষেত্রে প্রণিদানযোগ্য-

ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর প্রতিপালক তাবারাক ওয়া তা‘আলা থেকে যা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্ম ও অসৎকর্ম (উভয়ই) লিখে রেখেছেন। তারপর তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

অতএব, যে ব্যক্তি কোনো সৎকর্ম করার ইচ্ছা করল; কিন্তু তা করল না- আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাছে সেটিকে পূর্ণ এক সৎকর্ম হিসেবে লিখে দেন।

আর যদি সে সৎকর্ম করার ইচ্ছা করে তা বাস্তবায়ন করে- তবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাছে সেটিকে দশটি সৎকর্ম থেকে শুরু করে সাতশ গুণ পর্যন্ত; বরং তারও বহু গুণ বাড়িয়ে লিখে দেন।

আর যে ব্যক্তি কোনো পাপকর্ম করার ইচ্ছা করল; কিন্তু তা করল না- আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাছে সেটিকে পূর্ণ এক সৎকর্ম হিসেবে লিখে দেন।

কিন্তু যদি সে পাপকর্ম করার ইচ্ছা করে তা বাস্তবায়ন করে- তবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাছে সেটিকে মাত্র একটি পাপকর্ম হিসেবেই লিখে দেন।”

এই হাদীসের বাণীকে সামনে রেখে আমরা পুরো রমজান মাসের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি। তাতে সৎকাজটি করা সম্ভব না হলেও সওয়াব আর করা সম্ভব হলে কমপক্ষে সত্তরগুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে ভালো কাজের চিন্তাটি আমাদের মজ্জাগত হয়ে যাবে, চরিত্রে পরিণত হবে। পরিণামে একজন মুত্তাকী মুসলমান, ভালো ও আদর্শ মানুষে পরিণত হওয়া সম্ভব হবে। এটিই মানব জীবনের জন্য রমজানের বড় উপহার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত