ঢাকা বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

‘ইসি তড়িঘড়ি গেজেট প্রকাশ করে হাত মুছে নিয়েছে’

‘ইসি তড়িঘড়ি গেজেট প্রকাশ করে হাত মুছে নিয়েছে’

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলার পর নির্বাচন কমিশন কেন তদন্ত ছাড়াই ‘তড়িঘড়ি’ করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করল, সেই প্রশ্ন তুলেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বদিউল আলম মজুমদার এ কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন তদন্ত করেনি। তারা তড়িঘড়ি করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করে দিয়েছে। গেজেট প্রকাশ করে তারা হাত মুছে নিয়েছে। তাদের আর কোনো কিছু করার নেই।

বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অযোগ্য, তারা যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে নির্বাচনী ফলাফলের সমীকরণ বদলে যায়। তখন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি বলেন, যখন এ রকম প্রশ্ন ওঠে, তখন নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে পারে। তদন্ত করে ফলাফল বাতিলও করতে পারে। আবার নতুন নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে তারা। এই নির্বাচনেও এই প্রশ্নগুলো উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তদন্ত করেনি। তারা তড়িঘড়ি করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করে দিয়েছে।

সুজন সম্পাদক বলেন, নির্বাচনের আগে অনেকের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ ছিল। তারা আদালত থেকে ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকের বিষয় নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। এ রকমও অভিযোগ উঠেছে যে অনেকে দ্বৈত নাগরিক এবং তারা প্রয়োজনীয় নথি না দিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছেন। এসব বিষয়ে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর গেজেট প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছিল। নির্বাচনের পরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুষ্ঠু হয়েছে কি না, সেটি ‘সার্টিফাই’ করারও সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটা পালন করেনি।

তবে এখনও সুযোগ আছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আরপিওর ৯১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি হলফনামা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে, কোনো অভিযোগ ওঠে, তাহলে গেজেট প্রকাশের পরেও এটা তদন্ত করে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারা নির্বাচনও বাতিল দিতে পারবে। সুজনের তথ্যে বলা হয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জনের মধ্যে ১৪৭ জন ঋণগ্রহীতা। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৫০ শতাংশ। তাদের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন ৩৬ জন। আর ১২৬ জনই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। সুজনের তথ্যে আরও বলা হয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে ঋণগ্রহীতার হার বেড়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের সময় কারচুপি কিংবা নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা, এ নিয়ে যদি প্রশ্ন উঠে তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে সে নির্বাচন বাতিল হতে পারবে এবং নির্বাচন কমিশন পুনঃনির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। এবার এই প্রশ্নগুলো উঠেছে, আপনারা তুলেছেন আমরাও তুলেছি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে নাই, নির্বাচন কমিশন বরং তড়িঘড়ি করে গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ করে দিয়েছে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বদিউল আলম বলেন, গেজেট প্রকাশ করার তাৎপর্য হল, যখন গেজেট প্রকাশ হয়, তখন নির্বাচন কমিশন মুক্ত হয়ে যায়। তাদের আর কোনো কিছু করার নাই। এখন আদালতের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনেরই তদন্ত করা ‘উচিত ছিল’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেহেতু এই প্রশ্নগুলো উঠেছে যে তড়িঘড়ি করে... আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছিলাম যেন তদন্ত সাপেক্ষে এই ঋণখেলাপি বিলখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক এবং বিভিন্ন যেসব ক্ষেত্রে অযোগ্যতা আছে, সেগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর যেন এই গেজেট প্রকাশ করে। আমরা এক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হয়েছিল কিনা এটা সার্টিফাই করতে। এটা গুরুত্বপূর্ণ।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৩২টি আসনে ভোট পুনর্নগণনার দাবি তোলে। এদিকে ভোটের ফল প্রকাশের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন। জামায়াতকে অভিযোগের বিষয়ে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সুজন সম্পাদক বলেন, নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন করার জন্য স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এখন তারা যেটা করে, রিটার্নিং অফিসাররা যে ফলাফল দেয়, এটাই তারা গেজেট হিসেবে প্রকাশ করেছে। তারা যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, সেই দায়িত্বটা পালন করেনি। প্রার্থী বাছাইয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিকদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, যদি হলফনামা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে, কোনো অভিযোগ ওঠে, তাহলে নির্বাচন কমিশন এখনো, এই গেজেট প্রকাশের পরেও তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তারা নির্বাচনও বাতিল দিতে পারবে। আপনাদের (সাংবাদিকদের) সুযোগ আছে, আপনারা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করুন। যদি কোনো তথ্য পান, তাহলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে বাধ্য এবং তদন্ত করে তারা নির্বাচন বাতিল করতে পারবে। এই সুযোগটা আমাদের আছে।

২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদ কোটি টাকার বেশি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদ কোটি টাকার বেশি বলে উঠে এসেছে সুজনের প্রতিবেদনে। তারা বলছে, কোটিপতি বিজয়ী প্রার্থীর এই হার মোট প্রার্থীর ৯১.২৫ শতাংশ। আর ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক ১৮৭ জন (৬২.৯৬%)।

সংবাদ সম্মেলনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০১ জনই (৯৬.১৭%) কোটি টাকার অধিক সম্পদের মালিক। জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জনের মধ্যে এই সংখ্যা ৫২ জন (৭৬.৪৭%)।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক মাত্র দুইজন (০.৬৭%)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা তিনজনসহ এই সংখ্যা ৫ জন (১.৬৮%)।

সুজনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৫৫.৬৩%। পক্ষান্তরে ২৫ লক্ষ টাকার কম সম্পদের মালিকদের হার ছিল ১৮.৭১% (৩৭৯ জন)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৫৮ জনসহ এই হার ছিল ২১.৫৭% (৪৩৭জন)। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের তুলনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে এই হার ছিল ৮৯.৯৭%; বর্তমানে যা ৯১.২৫%। পক্ষান্তরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৫ লক্ষ টাকার কম সম্পদের মালিকদের হার ছিল ৩.০১%; বর্তমানে যা ০.৬৭%।

সুজনের হিসাবে শীর্ষ দশ সম্পদশালী এমপি হলেন- শরীয়তপুর-১ আসনের বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাঈদ আহমেদ। সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ১৯৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ টাকা। ফেনী-৩ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু। মোট সম্পদ ৯৪৬ কোটি ৮১লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ টাকা। কুমিল্লা-৮ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত জাকারিয়া তাহের। সম্পদের পরিমাণ ৭৭০ কোটি ৮৯লাখ ১৭ হাজার ৭৯৪ টাকা। বগুড়া-৫ আসনে বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। মোট সম্পদ ৬১৩ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার ৯৯৭ টাকা। শরিয়তপুর-২ আসনে বিএনপির মো. সফিকুর রহমান (কিরণ)। মোট সম্পদ ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৯০ টাকা। ময়মনসিংহ-১১ আসনে বিএনপির ফখর উদ্দিন আহমেদ। সম্পদের পরিমাণ ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪২ টাকা। মৌলভীবাজার-৩ আসনে নির্বাচিত বিএনপির নাসের রহমান। মোট সম্পদ ৩৮০ কোটি ৬৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৯ টাকা। চাঁদপুর-২ আসনে বিএনপির মো. জালাল উদ্দিন। সম্পদের পরিমাণ ৩৬৪ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ১০৬ টাকা। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। সম্পদের পরিমাণ ৩২৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৬ টাকা। চাঁদপুর-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল হান্নান। মোট সম্পদ ৩১৮ কোটি ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৪২৮ টাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত