
তারাবি নামাজ রমজান মাসের খাস ইবাদত। রমজানে রোজাদার দিনের বেলা রোজা রাখে, রাতে এশার নামাজের পর তারাবি নামাজ পড়ে দীর্ঘসময় নিয়ে। রমজান ছাড়া অন্য মাসে রোজা রাখলে তারাবি পড়ার বিধান নেই। সে হিসেবে তারাবি রমজানের অলংকার হিসেবে গণ্য।
তারাবিতে এক খতম কুরআন পড়ার রেওয়াজ চলে আসছে ইসলামের শুরু থেকে। নবী করীম (সা)-কে রমজান মাসে মসজিদে একদিন রাতে ব্যতিক্রমী নফল নামাজ পড়তে দেখে সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে নামাজে শরিক হন। পরদিন মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় দিন বিপুল সংখ্যক সাহাবী মসজিদে অপেক্ষায় থাকেন নবীজি আগের দিনের মতো নামাজের জন্য বেরিয়ে আসবেন- এ আশায়। কিন্তু তিনি বের হননি।
পরের দিন তিনি সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে বললেন, রাতে তোমরা নামাজের জন্য যে হারে জড়ো হয়েছ, আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা এই নামাজ জামাত সহকারে তোমাদের উপর ফরজ করে দেন কি না। তখন তোমাদের জন্য কষ্ট হবে। সেই চিন্তা থেকে আমি নামাজের জন্য বের হইনি। এই ঘটনার পর থেকে সাহাবাগণ রমজানে মসজিদে নববীতে একাকী নামাজ পড়ছিলেন উৎসবের আবেগে ও আমেজে।
হযরত ওমর (রা)-এর শাসনকালে তিনি রমজানের রাতে মসজিদে সাহাবায়ে কেরামের বিপুল উপস্থিতি ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করেন। তখন তিনি হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা)-এর ইমামতিতে একত্রে ২০ রাকাত তারাবি পড়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। সেই সিদ্ধান্ত সাহাবায়ে কেরাম মেনে নিলেন, বিপুল উদ্দীপনায় তাতে অংশ নিলেন। পরে একদিন হযরত ওমর এ দৃশ্য দেখে মন্তব্য করলেন, ‘খুবই চমৎকার এক নব উদ্ভাবিত ব্যবস্থা’।
জামাত সহকারে তারাবি নবীজির সময়ে ছিল না, সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতে তা প্রবর্তিত হল। তখন থেকে ২০ রাকাত তারাবির জামাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। একজন সাহাবীও হযরত ওমর (রা) এর সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলেননি। ৮ বা ১০ রাকাত তারাবি-এর কোনো প্রসঙ্গই তখন আসেনি। এরপর থেকেই দীর্ঘ দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে ২০ রাকাত তারাবির ধারাবাহিকতা চলে আসছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের চারজন ইমাম, ইমাম আবু হানিফা (র), ইমাম শাফেঈ (র), ইমাম মালেক (র) ও ইমাম আহমদ (র) প্রত্যেকের মতানুযায়ী তারাবি নামাজ ২০ রাকাত। সে অনুযায়ী ২০ রাকাত তারাবিতে একমাসে একবার কোরআন মজিদ সম্পূর্ণ শেষ করা হয়, যাকে বলে খতমে কোরআন।
আমাদের ছোট বেলায় কোরআনের আয়াতসমূহের মাঝে মাঝে আয়াত নম্বর বসানো ছিল না, এখন দেদারচে নম্বর ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ আপত্তি করছে না, আপত্তি করার কথাও নয়। এছাড়া আগে থেকে কোরআনের পারা বা আয়াত চিহ্নিত হওয়ার জন্য কিছু চিহ্ন ব্যবহৃত হত।
কোরআন প্রথম যখন নাজিল হয় এবং লিপিবদ্ধ করা হয়, তখন আরবি অক্ষরের গায়ে, উপরে নিচে নোকতা বা বিন্দু ছিল না। পরে বিন্দু দিয়ে সাজানো হয় হরফগুলো। উচ্চারণের জন্য যতিচিহ্ন কিংবা যের, যবর পেশ-এর ব্যবহার ছিল না, অনারবদের তেলাওয়াতের সুবিধার্থে যের, যবর, পেশ আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে বাক্য বিন্যাসের দাড়ি-কমা ইত্যাদি আরোপিত হয়।
নাজিল হওয়ার সময় কোরআনের বিন্যাস হয়েছিল ১১৪ সূরায়। সাহাবায়ে কেরাম প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং পুরো এক মাসে একবার তেলাওয়াত শেষ হত। এ কারণে, কোরআন মজীদকে মাসের ত্রিশ দিন হিসেবে ত্রিশ ভাগ করা হয়, যাকে আমরা পারা বলি। পারা ফারসি শব্দ, অর্থ টুকরা, অংশ। পারা ফারসি হলেও বর্তমান ইরানে কোরআনের ক্ষেত্রে পারা বলা হয় না, বলা হয় জুয। জুয আরবি শব্দ, মানে অংশ, টুকরা। আমরা যদি বলি আমপারা, ইরানীরা তা বুঝবে না, বলতে হবে আম্মেজুয। কেন এমনটি হল, আমাদের এই অঞ্চলে ফারসি এসেছে মোঘল আমলের আগে। তখনকার অনেক ফরসি পরিভাষা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ইরানের সমাজ ও সংস্কৃতিতে অনেক বিবর্তন এসেছে। সেই বিবর্তনে ফারসি আরবির প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। সেই প্রভাব ৪০০ বছর পর্যন্ত আমাদের দেশে আসেনি।
শুনে আশ্চর্য হবেন, আমাদের দেশে প্রচলিত নিখাঁদ ফারসি অনেক পরিভাষা ইরানীরা বুঝবে না। যেমন ঈদগাহ, ইরানীদের কাছে শব্দটি অপরিচিত। তারা বলেন, মুসল্লি বুজুর্গ বড় জায়নামাজ। জায়নামাজ মানে নামাজের জায়গা। বর্তমান ইরানে এরও ব্যবহার নেই। ইরানে বলা হয় মুসল্লা, অরিজিনাল আরবি। জায়গা শব্দটিও ফারসি; এমনকি স্থান শব্দের শিকড়ও ফারসির জমিনে প্রোথিত। পায়খান মানে, যে ঘরে শুধু পা রাখা হয়। শৌচাগার বুঝাতে শব্দটির দেদার ব্যবহার ছিল আমাদের দেশে শহরে গ্রামে। কত সুন্দর মার্জিত একটি পরিভাষা। পায়খানা বলতে এখন ‘মল’ বুঝানো হয়। বর্তমান ইরানে শব্দটি সম্পূর্ণ অপরিচিত। আধুনিক পরিভাষা টয়লেট সেখানে পায়খানার স্থান দখল করেছে, তারা বলে তোয়ালেত।
কোরআনের বাক্য, শব্দ বা পাঠ ও উচ্চারণ সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন চিহ্নের কথা বলতে গিয়ে কথা এতদূর গড়াল। কোরআন মজীদের প্রায় প্রতিটি পাতায় পাশে টীকার মতো করে ‘আইন’ অক্ষর লেখা আছে। ‘আইন’ চিহ্ন রুকু বুঝায়। নামাজে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ঝুঁকে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা হয়, এর নাম রুকু। যারা অন্তত রুকুতে গিয়ে নামাজে শামিল হয় তারা এক রাকাত পেয়েছে বলে গণ্য হয়। তারাবিতে প্রতি রাকাতে যতটুকুন কোরআন তেলাওয়াত করা হয় তার সীমা চিহ্নিত করার জন্য রুকু চিহ্নটি ব্যবহৃত হয়েছে। পুরো কোরআনে ৫৪০টি রুকু আছে। ২০ দিয়ে ভাগ দেন, ফলাফল আসবে ২৭। তার মানে প্রতিদিন বিশ রাকাত নামাজে ‘রুকু’তে চিহ্নিত পরিমাণ কোরআন পড়লে ২৭ দিনে একবার কোরআন খতম হয়ে যাবে। এই হিসাবটি সামনে আনার উদ্দেশ্য, আমরা যাতে বুঝতে পারি, তারাবি কখনও ৮ বা ১০ রাকাত ছিল না। সবসময় ছিল ২০ রাকাত। এটিই ইসলামী উম্মাহ ও মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য। ৮ রাকাত পড়া হলে কিছুতেই তারাবি নামাজে একবার কোরআন খতম করা সম্ভব হবে না। সম্ভব হলেও একেক রাকাত অনেক দীর্ঘ হবে এবং তা মুসল্লিদের জন্য কষ্টকর, অযৌক্তিক ও বিরক্তিকর হবে। আশা করি এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।
রমজানের অফুরান রহমতের পরশে সিক্ত স্নিগ্ধ অন্তরে অতিশয় পবিত্রতায় নামাজরত অবস্থায় আল্লাহতায়ালার পবিত্র বাণী হৃদয়মন একাত্ম হয়ে শোনার এবং আল্লাহতায়ালার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ার পরম সৌভাগ্য সবাইকে নসিব করুন।