ঢাকা রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রহমান রহিম নামের তাৎপর্য

রহমান রহিম নামের তাৎপর্য

এই বিশাল সৃষ্টিজগতকে আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে সাজিয়েছেন। সেই রহমতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য আমরা যখন বলি ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ তখন অফুরান রহমতের হাতছানি আমাদের মাথার উপর ছায়া বিস্তার করে। বিসমিল্লাহ উচ্চারিত দুটি শব্দ রহমান, রহিম। রহমান মানে দয়াবান, আর রহিম মানেও পরম দয়ালু; সমার্থক, প্রায় একই অর্থ বহন করে। পরিষ্কার-পরিছন্ন-এর মতো, মাঝখানে ফারাক দেখি না। হ্যাঁ, আধ্যাত্মিক পরিভাষা রহমান ও রহিমের মধ্যে সামান্য তফাৎ আছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, তিনি দুনিয়ার জন্য রহমান আর দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য রহিম। একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। রহমান আল্লাহর দয়া-দান দুনিয়ার সর্বত্র বিরাজমান। সূর্যের তাপ, চাঁদের আলো, বাতাসের প্রবাহ, পানির প্রাচুর্য ভালো মন্দ, মুসলমান কাফের সবার জন্য উন্মুক্ত। এমন নয় যে, আকাশের মেঘমালা খাঁটি ঈমানদার মুত্তাকি দেখে বৃষ্টি বর্ষণ করে আর কাফের পাপাচারীদের উপর বজ্রপাত করে। বসন্তের সমীরণ আল্লাহর নাফরমান বা অবাধ্য দুরাচারী সবার বাগানে সমারোহ আনে। এই বাস্তবতা দেখে, কোনো কোনো বস্তুবাদী বলে, খামোখা মোল্লারাই কাফের-মুমিনে তফাৎ করে; নচেত আল্লাহর দয়া-দান সবার জন্য এক সমান। আল্লাহর চোখে কোনো তফাৎ নেই।

বুঝতে হবে, তিনি শুধু রমহান দয়াবান নন, তিনি রহিমও। অর্থাৎ পরম দয়ালু, বিশেষ দয়াবান। রহিম আল্লাহর দয়া যারা পেয়েছে শুধু তারাই ঈমানের সম্পদ লাভ করেছে। ইবাদত বন্দেগি সৎভাবে জীবনযাপনের সৌভাগ্য তাদেরই নসিব হবে, যারা আল্লাহর রহিমিয়্যত-এর পরশ লাভ করেছে।

বুঝা গেল, আল্লাহ ভালো মন্দ, মুমিন-কাফির সবার প্রতি সমানভাবে রহমান, তার এই দয়া নিয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগত চলমান। তবে তিনি শুধু মুমিন মুসলমান, মুত্তাকি সৎকর্মশীলদের প্রতিই রহিম, বিশেষ দয়ালু। শুধু কি তাই!

ইহকাল শেষে যে পরকাল আসবে সেই পরকালে আল্লাহর রহিমিয়্যতের ফল্গুধারারাই বহমান থাকবে। সেখানে কাফের নাফরমনরা আল্লাহর কোনো দয়ার অংশ পাবে না। সেখানে একমাত্র মুমিনরাই ভোগ করবে আল্লাহর অফুরন্ত রহমত।

সরকার একটি অনাবাদি বিশাল ভূখণ্ডে জনবসতির বিস্তার ঘটাবে। ঘোষণা দিল, এই ভূখণ্ডের যেখানে যার ইচ্ছা বসতি গড়তে পারবে, তবে সরকারি দপ্তরে টোকেন-মানি দিয়ে ভূমি রেজিস্ট্রি করতে হবে। এই সুযোগে বিপুলহারে মানুষ এসে জনবসতি গড়তে লাগল। সরকারিভাবে সরবরাহকৃত পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ করতে লাগল। কিছু লোক সরকারি ঘোষণায় আমল দিয়ে টোকেন-মানি দিয়ে জমি নিজের নামে লিখে নিল; কিন্তু উদ্যত প্রকৃতির কিছু লোক বলল, এমন বিশাল খোলামাঠ এখানে আবার অফিসে গিয়ে অনুমতি কেন নিতে হবে। মেয়াদ শেষে সরকারি লোকেরা এসে তল্লাশি চালাতে লাগল। দেখা গেল, যারা সরকারের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণস্বরূপ টোকেন-মানি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে তাদের সহায় সম্পদ নিরাপদ; কিন্তু যারা ঔদ্ধত্য করে কিংবা সরকারি আদেশের ধার ধারেনি, তাদের ঘরাবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হল।

এই পৃথিবীর জীবন শেষে মুসলমান ও কাফেরদের অবস্থাও এমনই হবে। যারা আল্লাহর অবারিত দয়াদান ভোগ করে আল্লাহ ও রাসুলের আদেশ মেনে ঈমানদারের খাতায় নাম রেজিস্ট্রি করেছিল তারা নিস্তার পেয়ে যাবে, পুরস্কৃত হবে। আর যারা জমি রেজিস্ট্রি করেনি, উচ্ছেদ অভিযানের কবলে তাদের জীবন সহায়-সম্পদ তছনছ হয়ে যাবে। এমনকি ভূমি দস্যু হিসেবে জেল জরিমানার সম্মুখীন হবে।

বুখারি, মুসলিম ও মুসনদে আহমদে বর্ণিত এক হাদিসে এই তত্ত্ব ও পার্থক্যটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, হযরত নবী করিম (সা) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর একশতটি রহমত রয়েছে। তিনি এর মধ্যে একটি রহমত দুনিয়াবাসীর মধ্যে বণ্টন করেছেন, যা তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত করে রেখেছে। আর বাকি নিরানব্বইটি রহমত তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াবাসীদের মধ্যে বণ্টিত সেই এক রহমতও কিয়ামতের দিন ফিরিয়ে নেবেন এবং তা ঐ নিরানব্বইটির সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য পূর্ণ একশত রহমত সম্পূর্ণ করবেন।’

হাদিসের অন্য বর্ণনায় বিষয়টি এভাবে এসেছে- ‘আল্লাহ তাআলার একশটি রহমত রয়েছে। তিনি তার মধ্য থেকে একটি রহমত দুনিয়াতে নাযিল করেছেন, যার দ্বারা মানুষ, জিন, পশু-পাখি ও সব সৃষ্টি পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করে; এমনকি বন্য জন্তু তার সন্তানকে স্নেহ করে। আর নিরানব্বইটি রহমত আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যার দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া করবেন।’

নারী পুরুষের প্রেম আকর্ষণ, মা-বাবার প্রতি সন্তানের আর সন্তানের প্রতি মা-বাবার শাশ্বত ভালোবাসার পেছনেও আছে আল্লাহর রহমতের সেই আকর্ষণ। শুধু তাই নয়, গ্রহ নক্ষত্র সৌরমণ্ডলের মহা আয়োজন, পরস্পর আকর্ষণ-বিকর্ষণ, পৃথিবীর স্থিতিস্থাপক মধ্যাকর্ষণ সবকিছুর মধ্যে আছে আল্লাহর রহমতের বন্ধন।

রমজানে রহমতের যে ফল্গুধারা তা পৃথিবীর জমিনে নিয়ে আসে আল্লাহর রহিমিয়্যতের হাতছানি। যারা ঈমানদার, রোজাদার, রাত জেগে যারা ইবাদত করে, শবে কদর তালাশ করে, সাহরি ইফতারে আল্লাহর সান্নিধ্যের চেতনায় যারা প্রাণিত, যারা আল্লাহর ভালোবাসায় যাকাত দেয়, সদকা দেয়, ফিতরা দেয়, ঈদের উৎসবে মেতে উঠে, নিজেকে সংশোধন করতে উদ্যোগ নেয়, মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত হয়ে সুন্দর চারিত্রিক সুষমায় নিজকে সজ্জিত করে তারাই আল্লাহর খাস রহমতের ভাগী হয়, তাদের জন্যই অপেক্ষমান জান্নাত।

হাদিস শরিফে আছে, জান্নাতে প্রবেশের একটি বিশেষ গেট আছে, নাম তার রাইয়ান। যারা রমজানে রোজা রেখেছে তারাই শুধু রাইয়ান গেইট দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে।

রব্বুল আলামিন আমাদের তোমার খাস রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে শামিল কর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত