
পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনার একটি অনুষঙ্গ দান-সদকা। রমজানে কোনো নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য সময়ে ফরজ ইবাদতের সমান; আর ফরজ আমলের সওয়াব অন্য সময়ের ফরজের চাইতে ৭০ থেকে ৭০০ গুণ বেশি। সওয়াবের অঙ্কে এই বাড়তি লাভের আশায় যাদের উপর জাকাত ফরজ হয়েছে তারা রমজানেই জাকাত দেন। ধনী ছাড়াও সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশীহারে দান-সদকা করেন। নিজের পরিবার পরিজনের জন্যও পানাহার, ঈদের উপহারের ব্যবস্থা করেন। এসব কাজ যদি আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন লক্ষ্য হয়, তাহলে সব ধরনের অর্থব্যয় সদকা হিসেবে গণ্য হবে। পরিবারের জন্য অর্থব্যয় করা সহজ হলেও অন্যদের জন্য অর্থ ব্যয় করা তত সহজ নয়। প্রাণান্ত চেষ্টা কষ্ট-পরিশ্রমে যে অর্থকড়ি উপার্জন করল, তা কোনো স্বার্থ ছাড়া, ভবিষ্যতে বেশি পাওয়ার হিসাব-নিকাশের বাইরে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া মোটেও সহজ নয়। বিদেশি এনজিওরাও দান-সদকা করে; তবে তার পেছনে ভবিষ্যতে বা ভিন্নভাবে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে।
প্রকৃত নিঃস্বার্থ দান-সদকা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী, যারা মনে করে, আমি যে ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছি, তা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং সমায়িক সময়ের জন্য দেওয়া হয়েছে, এই সম্পদ আল্লাহর নির্দেশে অসহায় মানুষের সেবায় দান করতে হবে, সম্পদ দিয়ে আল্লাহ যে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এই বিশ্বাস ও মনোভাব পোষণকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, দানশীল আল্লাহর কাছের, মানুষের কাছের, জান্নাতের কাছের লোক আর কৃপণ আল্লাহর থেকে দূরের, জনগণ থেকে দূরের, জান্নাত থেকে দূরের এবং জাহান্নামের কাছের লোক। -(তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৬১)।
হাদীসের এই বাণী যুক্তি দিয়ে বুঝানোর প্রয়োজন নেই। যারা নিঃস্বার্থভাবে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য ব্যয় করবে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা, মানুষের ভালোবাসা অবশ্যই পাবে, সহজ হিসাব। এ জন্যেই দানশীল আল্লাহর বন্ধু, দানশীলকে মানুষ ভালোবাসে আর কৃপণকে মানুষ ঘৃণা করে, সে আল্লাহর শত্রু।
আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের রোগ বালাই নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য অনেক ওষুধ আবিষ্কার করেছে; কিন্তু যে কৃপণতার রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কৃপণ লোক আল্লাহর বিরাগভাজন, গণমানুষের দুশমন এবং শেষ পর্যন্ত জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে, তা সারানোর কোনো ওষুধ চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি।
হ্যাঁ, সে ওষুধ দান করেছেন স্বয়ং আল্লাহ। আল্লাহ বলেন, ধনীদের মনোরোগ চিকিৎসা, তাদের হিংসা-বিদ্বেষ কৃপণতা থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য একটি পথ আছে, সেটি হলো-
‘হে নবী! আপনি তাদের সম্পদ হতে সদকা গ্রহণ করুন, এই সদকা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের পবিত্র করুন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করুন। আর তাদের জন্য দোয়া করুন। কেননা, আপনার দোয়া তাদের জন্য শান্তিদায়ক। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ -(সূরা তাওবা, আয়াত-১০৩)।
অর্থাৎ তারা যখন সদকা দেয় তখন মনের জমিন থেকে হিংসা ও কৃপণতার শিকড় উপড়ে যায়, তাযকিয়া হয়, পরিশুদ্ধি অর্জন হয়। তাদের সম্পদের প্রতি কারও হিংসা থাকবে না, ঘৃণা থাকবে না, জনমানুষের ভালোবাসায় তারা সিক্ত হবে। তাতে তাদের জন্য আপনার দোয়া হবে, সোনায় সোহাগা।
সদকার বহুমুখী উপকার ও পুরস্কার কী পরিমাণ মানুষ তা হিসাব-নিকাশ করতে; কিংবা অনুমান করতে পারবে না। আল্লাহতায়ালা নিজেই তার বিবরণ দিয়েছেন-
‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজ, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
যারা আল্লাহর পথে ধনৈশ্বর্য ব্যয় করে অতঃপর যা ব্যয় করে তার কথা বলে বেড়ায় না এবং ক্লেশও দেয় না, তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
যে দানের পর ক্লেশ দেওয়া হয় তা অপেক্ষা ভালো কথা ও ক্ষমা উত্তম। আল্লাহ অভাবমুক্ত, পরম সহনশীল। -(সূরা বাকারা, আয়াত-২৬১, ২৬২, ২৬৩)
নবী করীম (সা.) বলেন, ‘সদকা গোনাহকে নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।’-(তিরমিযি)।