ঢাকা সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল

জাতিসংঘের প্রতিবেদন
এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল, কারণ একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গতকাল রোববার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) উচ্চ প্রতিনিধির কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রস্তুত করা ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্তপূরণ করলেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জলবায়ু ঝুঁকি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি।

মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা জোরদার, পর্যাপ্ত নীতিগত পরিসর এবং সামগ্রিক সমাজভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করায় আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তরণের কথা নির্ধারিত রয়েছে। তবে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার রপ্তানি আদেশ হারানোর সম্ভাবনা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের কাছে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন চেয়েছিল।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার কথা উল্লেখ করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার আবেদন করে। সিডিপি এ আবেদন মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউএন-ওএইচআরএলএলএস সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে এ মূল্যায়ন পরিচালনা করে।

প্রতিবেদনটিতে উত্তরণ ব্যবস্থাপনায় দেশের প্রস্তুতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে এলডিসি-নির্দিষ্ট সহায়তা প্রত্যাহারের প্রভাব ও উন্নয়ন অর্জন ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের পরামর্শক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও ড্যানিয়েল গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় বহু-অংশীজন পরামর্শ সভায় এই ফলাফল তুলে ধরা হয়।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন মন্ত্রী, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ ও সরকারি উপদেষ্টারা।

এলডিসি থেকে উত্তরণের মতো পূর্ণ প্রস্তুতি নেই - অর্থমন্ত্রী : দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠলেও এখনো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতো পূর্ণ প্রস্তুতি নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দেনার চাপ, উচ্চসুদের হারে ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল রোববার শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের উত্তরণ প্রস্তুতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সংস্থা (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) একটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে, যার মূল বিষয়গুলো এই সভায় উপস্থাপন করা হয়।

মন্ত্রী বলেন, জ্বালানিসংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়বে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বাংলাদেশ এখনও তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘদিন এই চাপ বহন করা সরকারের জন্য সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সরকার জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। কিন্তু সরকারি তহবিল থেকে ধারাবাহিক ব্যয় চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জনগণের ওপরই পড়বে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে একদিকে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা যায় এবং অন্যদিকে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রতিদিনের সংকট মোকাবিলা’ হিসেবে বর্ণনা করে মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। সরকার এখন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে; কিন্তু জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে চাপ আরও বাড়ছে। সংকট উত্তরণে সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে উত্তরণ প্রক্রিয়া কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে উত্তরণ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাবাব ফাতিমা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে জাতিসংঘ : বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছানো এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রশংসাও করেছেন তিনি। গতকাল রোববার আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা জানান জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং জাতিসংঘের ইউএন-ওএইচআরএলএলএসের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। বৈঠকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ সময়সীমা পেছানো ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণ সম্পন্ন করতে চায়, যেন দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং শিল্প খাত কোনো ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত