
বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দেশে গতকাল রোববার পর্যন্ত হামে ২৪ এবং উপসর্গ নিয়ে ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে হাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে রুরাল সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে হামের টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হাম আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫০ জনে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, সরকারের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী দলও হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছি এবং দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক করেছি। সেখান থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ সরকারকে জানানো হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টির একটা কারণ। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার গণটিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে এই কর্মসূচি শুরু হয়; যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আগামী ১১ মে পর্যন্ত চলবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এ এলাকায় ৪৫০টি স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ডা. রফিকুল ইসলাম অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজ নিজ শিশুদের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এই কর্মসূচিকে সফল করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন- বিএনপির সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. এস এ শাফি, সহকারী পরিচালক ডা. মো. নুরুল হকসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু : হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ছয়টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৬২টি শিশু। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫০ জনের। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এই হিসাব ১১ এপ্রিল সকাল আটটা থেকে আজ ১২ এপ্রিল সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ের। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে যে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা সবাই ঢাকার। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া ছয় শিশুর পাঁচটি ঢাকা বিভাগের, একটি খুলনার। এই সময়ে সর্বোচ্চ ১২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ২১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। আর সবচেয়ে কম ১ জন করে হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও সিলেটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ২৬৮ জনের মধ্যে। এর মধ্যে ৫৮০ জনই ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৬২ জন, যার মধ্যে ৩৫৭ জনই ঢাকা বিভাগে। সবচেয়ে কম রোগী ভর্তি হয়েছে রংপুর (১১) ও ময়মনসিংহে (২২)।
এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৬৩৪ জন গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩১২ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১২০ জন হাসপাতাল ছেড়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৯ দিনে হামে মোট ২৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫১টি শিশুর। এ ছাড়া গত ২৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ১৫ হাজার ৬৫৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২২৫ জন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৬৩৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন ৭ হাজার ৬৫৬ জন।
সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব - স্বাস্থ্যমন্ত্রী : ‘জরুরি হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন‘জরুরি হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জরুরি হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর নগর ভবন অডিটোরিয়ামে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ৫ তারিখ থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হলেও গতকাল থেকে ঢাকা দক্ষিণসহ গুরুত্বপূর্ণ চারটি সিটি কর্পোরেশনে (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল) একযোগে এই কার্যক্রম শুরু হলো। তিনি সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে মহাখালী সংক্রামক রোগ হাসপাতালে দ্রুততার সঙ্গে আইসিইউ ইউনিট চালু করার কথা উল্লেখ করেন এবং এ কাজে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগজনক। বর্তমান সরকার এই কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গণমাধ্যমকে অনুরোধ করব, তারা যেন সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন, বিশেষ করে শ্রমজীবী অভিভাবকদের কাছে টিকার গুরুত্ব পৌঁছে দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, বিগত সরকারের অসাবধানতার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে আমরা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর। মাঠপর্যায়ে অলিগলি পর্যন্ত গিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আয়োজিত এই জরুরি হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ এর আওতায় মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিএসসিসি এলাকাজুড়ে সর্বমোট ৫৪০টি টিকাদানকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে; যার মধ্যে ৯০টি স্থায়ী এবং ৪৫০টি অস্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে সেবা দেবে। ক্যাম্পেইন চলাকালীন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে। এপ্রিলের ১২ তারিখ থেকে ১১ মে পর্যন্ত মাসব্যাপী এই টিকাদান কার্যক্রম চলবে। কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে আরও ছিলেন- ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ এমানুয়েল আব্রিউক্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. রাজেশ নারোয়াল।