
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা। পাম্পগুলোতে ডিজেলের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন এবং পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ঢাকার সড়কগুলো থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ বাস। এতে দিনের ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারছেন না যাত্রীরা। এদিকে, অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বাড়ল ২১২ টাকা। চলতি মাসে এ নিয়ে দুবার দাম বাড়ানো হলো।
মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরোক্ষ শর্তে দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়।
দেশের অন্যতম প্রধান পণ্য পরিবহন রুট হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানিসংকটের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহনভাড়া ট্রাকপ্রতি এমনিতেই গড়ে ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকরের ফলে পণ্য পরিবহন খরচ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি অনিল চন্দ্র পাল।
অনিল চন্দ্র বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল। কিছুদিন ধরে সংকট চলায় এই ভাড়া ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে রোববার থেকে ডিজেল পাওয়া যাবে। এ খবরে ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকার আশপাশে নেমেছে। তবে তেল পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে পরিবহন খরচ কত হবে।’
কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে সারা দেশে চাল আসে। এত দিন খাজানগর মোকাম থেকে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জে ট্রাকভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। গত শনিবার পর্যন্ত এই ভাড়ায় রাজধানীতে চালের ট্রাক এসেছে। গতকাল থেকে ট্রাকপ্রতি ভাড়া দেড় হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বাড়বে। বগুড়ার মহাস্থান হাট হলো দেশের অন্যতম বড় সবজির পাইকারি হাট। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে সবজির চালান যায়। বগুড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৫ টনের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৬-১৮ হাজার টাকা। ট্রাকভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি চাওয়া হয়েছে।
সবজির দাম বাড়ছে : চালের পাশাপাশি শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্য ভোগ্যপণ্যের দামও একই হারে বাড়তে পারে। গতকাল সরেজমিন কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পটোল, শসা, পেঁপেসহ কিছু শাকসবজির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, অবধারিতভাবে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। কারণ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জীবনের পদে পদে খরচ বাড়ে। যেমন পরিবহন খরচ বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে শুধু সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত নয়, সব শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রায় আরেক দফা খরচ বাড়বে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজশাহী থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনে ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে চার-পাঁচ হাজার টাকা : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কাঁচামাল পরিবহন খাতে। রাজশাহীর বিভিন্ন মোকাম ও হাট থেকে ঢাকায় সবজি পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ট্রাকপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। রাজশাহীর একাধিক ব্যবসায়ী ও পরিবহন- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। আগে যেখানে রাজশাহী থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় যেতে ভাড়া লাগত ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। একইভাবে সিলেট, চট্টগ্রামে ৩০ থেকে ৩২ হাজারের জায়গায় ভাড়া লাগছে ৪০ হাজার টাকা।
সোমবার পবা উপজেলার নওহাটা বাজারে গিয়ে সবজি ব্যবসায়ী ও পরিবহনের মালিক-চালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ওই বাজারে ভোর থেকে শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত সবজি কিনেন ব্যবসায়ীরা। এরপর বস্তাবন্দি করা হয়।
দুপুরের আগে থেকে সবজির বস্তা ট্রাকে তোলা হয়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হতাশ সবজি ব্যবসায়ীরা। সবজি ব্যবসায়ী মো. রিপন পটোলে পানি দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আগে এক বস্তা পণ্য ঢাকায় পাঠাতে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা লাগত, এখন সেটা ২৫০ টাকা পর্যন্ত গিয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় গাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক জায়গায় পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে বাজারে কাঁচামালের দামও কমে যাচ্ছে। কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আরেক ব্যবসায়ী সোহাগ আলী ঢ্যাঁড়শ বাছাই করছিলেন।
তিনি জানান, প্রতি কেজি ঢ্যাঁড়শে এক টাকা করে খরচ বেড়েছে। এক বস্তায় ৮০ কেজি ঢ্যাঁড়শ আছে। তার মানে বস্তাপ্রতি ৮০ টাকা খরচ বাড়তি। এক বস্তা পণ্যে ৭০ থেকে ৮০ টাকা ভাড়া বেড়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই এই পরিবর্তন হয়েছে। খরচ বাড়লেও সব সময় সেই অনুযায়ী আয় বাড়ছে না। কথা হয় মো. আলী সরদার নামে ট্রাকমালিককের সঙ্গে। নওহাটা বাজার থেকে পাঁচণ্ডছয়টি ট্রাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি পণ্য পাঠান। মো. আলী বলেন, ‘এত দিন খরচ বাড়াননি। কিন্তু এক লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা বেড়েছে, না বাড়িয়ে উপায় নেই। আগে ঢাকার ভাড়া ছিল ২০-২১ হাজার টাকা, এখন ২৪-২৫ হাজার নিতে হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় আমাদের কিছু করার নেই।
বর্তমানে রাজধানীর অধিকাংশ সড়কেই গণপরিবহনের এমন চিত্র নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশজুড়ে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা। পাম্পগুলোতে ডিজেলের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন এবং পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ঢাকার সড়কগুলো থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ বাস। এতে দিনের ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারছেন না যাত্রীরা। পরিবহন মালিকরা বলছেন, তেল সংগ্রহ করতেই চালকদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে, ফলে বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে।
ঢাকার গুলিস্তান থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট রুটে চলাচল করা শুভযাত্রা পরিবহনের একটি বাসের চালক বিল্লাল হোসেন বলেন, তেলের জন্য আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। গাড়ির তেল নিতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় চলে যায়। এই সময়ে অন্তত একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু সেটি আমরা পারছি না। তিনি বলেন, তেল সংকটের কারণেই সড়কে গাড়ি কম দেখা যাচ্ছে। ফলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে বাসে উঠছেন।
পোস্তগোলা-মালিবাগ-মধ্যবাড্ডা-দিয়াবাড়ি রুটে চলাচল করা রাইদা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মকবুল হোসেন পাটোয়ারী বলেন, তেল সংকটের কথা আর কী বলব! আগে আমাদের গাড়িতে একসঙ্গে ৫ হাজার টাকার তেল নিতে পারতাম, যা দিয়ে ৩টি ট্রিপ দেওয়া যেত। এখন ৫ হাজার টাকার তেল নিতে অন্তত দুটি পাম্পে যেতে হয়। কেউ ৩০০০ বা ৩৫০০ টাকার বেশি তেল দিতে চায় না। এই তেল দিয়ে একটি বাস মাত্র ২টি ট্রিপ দিতে পারে। ফলে প্রতিটি বাসের একটি করে ট্রিপ কমে গেছে। বাসে উঠতে না পেরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বক্সের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাসলিমা স্বর্ণা নামে এক যাত্রী বলেন, বাসে যে পরিমাণ ভিড়, তাতে উঠতে না পেরে এই বাসটি মিস করলাম। পরের বাসের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে? বেশ কয়েক দিন ধরেই রাস্তায় বাসের সংখ্যা অনেক কম দেখছি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, রাজধানী ও শহরতলীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। বর্তমানে শুধু ডিজেল সংকটের কারণে ২০ শতাংশ বাস কম চলাচল করছে। ফলে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এক ট্রিপ শেষ করেই যদি তেল খুঁজতে হয় এবং তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে এই জ্যামের শহরে বাস চলবে কখন আর মানুষকে সেবা দেবে কখন?