ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হামের ভয়াবহতার মধ্যে কিট সংকট

হামের ভয়াবহতার মধ্যে কিট সংকট

দিনদিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হাম। প্রতিনিয়তই হামে আক্রান্ত হয়ে কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। এরইমধ্যে দেশে হাম শনাক্তের কিট সংকট দেখা দিয়েছে। দেশে হাম পরীক্ষার একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হাতে এখন ১৩টি কিট অবশিষ্ট আছে, যা দিয়ে হাজার দেড়েক নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। তবে এই কিট শেষ হওয়ার আগেই নতুন চালান আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান।

ঢাকার মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবেই শুধু হামের পরীক্ষা হয়। এই ল্যাবে দিনে ছয় শতাধিক নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। এর আগে গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে কিটের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এবার সেটি কমতে কমতে ১৩টিতে নামার তথ্য দিয়েছেন ইনস্টিটিউটের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের হিসাবে, একটি কিটের মাধ্যমে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। আর দেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে নমুনা আসে ৩০০টি। সেই হিসাবে ১৩টি কিটের মাধ্যমে আর পাঁচণ্ডছয় দিন নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।

ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, জানুয়ারি মাসে ছিল ৫৭টি কিট ছিল। পরে আরও ৭০টি কিট সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে ১২৭টি কিট এ বছর এসেছে। এরমধ্যে ১০ হাজার ৫৯৭ স্যাম্পল পরীক্ষ করতে ১১৪টি কিট শেষ হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমরা নমুনা পাঠানোর ৪ থেকে ৫ দিন পর ফল হাতে পাই। অনেক সময় এক সপ্তাহও লেগে যায়। বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে হামের পরীক্ষার ফল দ্রুত পাওয়া উচিত।’

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, ‘হামের টেস্টিং কিট আমাদের কাছে থাকা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ পরীক্ষাই হয়। তবে এখন কিটের সংখ্যা কমে গেছে। ‘আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে ৩০টি কিট পাওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সামনে আরও ১০০ কিট আসবে। তখন আবার সর্বোচ্চ হারে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।’ তিনি আরও বলেন, হামের কিটের মেয়াদ বেশি দিন থাকে না; ৬ মাসের মতো থাকে। ‘তাই খুব বেশি নিয়ে এসে সংগ্রহ করে রাখার মতো অবস্থাও নেই। কারণ সব কিট বিশ্ব স্বাস্থা সরবরাহ করে। আবার বিদেশে তৈরির পর আসতে আসতে আরও ১ মাস লেগে যায়।’

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু : সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামণ্ডসংক্রান্ত রোগে সাতজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। গতকাল বুধবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৬৮ জন। ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় হাজার ৯৯ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২৬০ জন। এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৮৮৫ জন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ২৭ হাজার ২২৩ জন।

হামণ্ডরুবেলাসহ ১০ ধরনের টিকার নতুন চালান দেশে পৌঁছেছে : হামণ্ডরুবেলা, ওরাল পোলিওসহ ১০ ধরনের টিকার নতুন চালান দেশে পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার দুপুর পৌনে ১২টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টিকার এই নতুন চালান আসে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে টিকার এই চালান গ্রহণ করেন। হামণ্ডরুবেলা-ওরাল পোলিও ছাড়াও এই চালানে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি ও টাইফয়েড টিকা রয়েছে। চালান গ্রহণ শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকা দেশে এসেছে। ভবিষ্যতে টিকার আর কোনো সংকট তৈরি হবে না।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, মাত্র ২৪ দিনের মধ্যে এসব টিকা দেশে এনে ইতিহাস গড়েছে সরকার। ১০ মের মধ্যে হামসহ আরও ১০ ধরনের ১ কোটি ৮ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ইপিআই প্রোগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল- স্বাস্থ্যমন্ত্রী : অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইপিআই কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল বুধবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় ইপিআই কার্যক্রমে ব্যবহৃত হামণ্ডরুবেলা (এমআর) টিকা এবং ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের (ওপিভি) চালান গ্রহণ শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী জানান, ১৯৭৯ সাল থেকে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১২টি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সফল কর্মসূচি এবং গ্যাভি বাংলাদেশকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ইপিআই কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করে এবং প্রায় ৫০ লাখ রোগের সংক্রমণ ঠেকায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে এ কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমান সরকার ইপিআইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কারণ এটি শিশুদের জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ভ্যাকসিন ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যে তা বাতিল করে ইউনিসেফের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করেছে। নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি রোগের প্রাদুর্ভাব বিবেচনায় বিশেষ ক্যাম্পেইনও পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী ‘হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত সময়ের আগেই ৫ এপ্রিল শুরু করা সম্ভব হয়েছে ইউনিসেফের সহযোগিতায়। এ জন্য তিনি রানা ফ্লাওয়ার্সকে ধন্যবাদ জানান।

মন্ত্রী জানান, সরকার এরইমধ্যে ইউনিসেফকে ৮৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে, যার মাধ্যমে ১০ ধরনের ৯৫ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৯ ও ১৭ এপ্রিল অর্থ ছাড়ের পর ৩ মে প্রথম চালানে ১৫ লাখ পাঁচ হাজার ডোজ আইপিভি ভ্যাকসিন আসে।

৬ মে আরও ১৫ লাখ ডোজ এমআর ও টিডি (৯০ হাজার ভায়াল) ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছেছে। আগামী ১০ মে’র মধ্যে আরও প্রায় এক দশমিক আট কোটি ডোজ এমআর, টিডি, বিসিজি, টিসিভি, বি-ওপিভি ও পেন্টা ভ্যাকসিন দেশে আসবে। ইউনিসেফ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর মধ্যে সম্পূর্ণ সরবরাহ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওপেন টেন্ডার বাতিলের পর অতিরিক্ত ৩৫ মিলিয়ন ডলারের ভ্যাকসিনও ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১৫ মাসের ভ্যাকসিন সংগ্রহ পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে তিন মাসের বাফার স্টক থাকবে।

বর্তমানে দেশে টিসিভি ও এইচপিভি ভ্যাকসিনের ২ বছরের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। নতুন সরবরাহের ফলে আগামী ৮ থেকে ১২ মাস অন্য ভ্যাকসিনেও কোনো ঘাটতি থাকবে না। মন্ত্রী বলেন, ভ্যাকসিন সংগ্রহ একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকার এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্বমানের কোল্ড চেইনের মাধ্যমে উৎপাদন থেকে মাঠপর্যায়ে ভ্যাকসিনের গুণগত মান বজায় রাখা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফ কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে মাইক্রোপ্ল্যানিং, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং। তিনি জানান, চলমান ‘হামণ্ডরুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এ ৫ মে পর্যন্ত এক কোটি ৬৮ লাখ ২১ হাজার ৬০৫ জন শিশু টিকা পেয়েছে এবং ৯৩ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছে। শতভাগ কভারেজ অর্জনের লক্ষ্যেই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত