ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কঠিন পরীক্ষার মুখে মধ্যপ্রাচ্য

কঠিন পরীক্ষার মুখে মধ্যপ্রাচ্য

মাসব্যাপী চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত বৃহস্পতিবার দুই দেশ একে অপরের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান বলেছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা পরিস্থিতির আর অবনতি চায় না। ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা দুটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ও ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। বিপরীতে মার্কিন বাহিনী বলেছে, ইরানের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই গুলি চালিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি এ পাল্টাপাল্টি হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ (সামান্য আঘাত) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর। এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো, যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে। ইরানের সামরিক কমান্ড অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্য একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।

সামরিক কমান্ড আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপ (ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ) এবং মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক লোকজনের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়। এমন এক সময়ে এ পাল্টাপাল্টি হামলা হলো যখন ওয়াশিংটন একটি শান্তি প্রস্তাবের ব্যাপারে ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধের কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।

ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র দাবি করেন, তাঁদের হামলায় মার্কিন বাহিনীর ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের কোনো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

সেন্টকম বলেছে, ইরান তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান দিয়ে হামলা চালিয়েছিল। সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেন্টকম পরিস্থিতির অবনতি চায় না, তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে তারা সদা প্রস্তুত এবং মোতায়েন রয়েছে।

ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আক্রান্ত হলে তারাও জবাব দেবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এক সামরিক মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জেনে রাখা উচিত যে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জবাবে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত করবে।’

ইরানের প্রেস টিভি পরে জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির পর হরমুজ প্রণালির ইরানি দ্বীপ ও উপকূলীয় শহরগুলোয় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়েছে। গত সোমবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, তারা ইরানের ছয়টি ছোট নৌকা ধ্বংস করেছে এবং ইরানের ছোড়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার মার্কিন চেষ্টা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানে তেহরান বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ওই সংঘাতের সূত্রপাত।

সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতির সূত্র ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হয়। তবে জাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি।

সামরিক কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপ, মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হামলাকারী ইরানিদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করা হয়েছে এবং তাদের বেশ কিছু ছোট নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘ওই নৌযানগুলো খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ডেস্ট্রয়ারগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া হয়েছিল, যা খুব সহজেই ভূপাতিত করা হয়েছে। একইভাবে ড্রোনগুলোও মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।’ এদিকে ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি দ্রুত চুক্তি সই না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও কঠোর হামলা চালানো হবে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবটি দিয়েছে, তাতে যুদ্ধ শেষ করার কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ বা হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার মতো মূল বিষয়গুলোর সমাধান করা হয়নি।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হতো। ইরান জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

সাম্প্রতিকতম এই সংঘাতের প্রভাবে বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও তেলের দাম ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তেলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানির এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। অন্যদিকে ইসরায়েল গত বুধবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে। গত মাসে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর বৈরুতে এটিই প্রথম ইসরায়েলি হামলা।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজে পাল্টা আক্রমণের দাবি তেহরানের : ইরানের জলসীমায় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানি সামরিক বাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চরম উত্তেজনার মুখে পড়েছে। এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, মিনাব শহর ও দেশটির হরমুজগান প্রদেশের সিরিক শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর নিশ্চিত করেছে।

ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোয় চালানো হামলাকে শুধু একটি ‘লাভ ট্যাপ’ বা ‘মৃদু টোকা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইরানের খতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক কিছু দেশের সহযোগিতায় ইরানের বেশ কিছু বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপ অন্যতম। বিবৃতিতে মার্কিন বাহিনীকে ‘আগ্রাসী, সন্ত্রাসী ও দস্যু’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তাদের পাল্টা আক্রমণে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। এই অভিযানে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং উচ্চ বিস্ফোরণের ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করেছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবি অস্বীকার করেছে। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের উসকানিমূলক আক্রমণগুলো তারা রুখে দিয়েছে এবং আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আঘাত করেছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং তারা উত্তেজনা চায় না, তবে নিজেদের সুরক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে।

উল্লেখ্য, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবরোধের বিপরীতে এটিই তেহরানের প্রথম সামরিক প্রতিক্রিয়া। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি ইরানি জাহাজ জব্দ করেছে। গত মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘নৌ অবরোধ’ তেহরানের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক জ্যেষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ইরানি আক্রমণের মুখে ওমান উপসাগরের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

এমন এক সময়ে এই সংঘর্ষের খবর এল, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধ বন্ধে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছিল। সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ ভাঙার নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

আক্রমণের মুখেও মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি বিশ্বমানের ডেস্ট্রয়ার অত্যন্ত সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ দাবি করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তিনটি ডেস্ট্রয়ারের কোনো ক্ষতি হয়নি, উল্টো ইরানি আক্রমণকারীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো লক্ষ্য করে ছোড়া মিসাইলগুলো সহজেই ভূপাতিত করা হয়েছে। ড্রোনগুলোকে আকাশেই ভস্মীভূত করা হয়েছে।

ডেস্ট্রয়ারগুলোর ক্রুদের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন,‘আমাদের তিনটি ডেস্ট্রয়ার তাদের চমৎকার ক্রুসহ এখন আবার আমাদের নৌ অবরোধে যোগ দেবে।’ এর আগে ইরান দাবি করেছিল যে তাদের হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওমান উপসাগরের দিকে পালিয়ে গেছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ইরানের সেই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিল।

আমিরাতে মিসাইল ও ড্রোন ছুড়ল ইরান : সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে আবারও মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। এগুলোর আঘাতে দেশটিতে তিনজন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ইরান থেকে এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, ইরান নতুন করে দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও তিনটি ড্রোন ছুড়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। তবে মিসাইল ও ড্রোনগুলো ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মিসাইল ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ইরানের ছোড়া ৫৫১টি ব্যালাস্টিক মিসাইল, ২৯টি ক্রুজ মিসাইল এবং ২ হাজার ২৬৩টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এরআগে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল আমিরাত। এর অংশ হিসেবে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সক্রিয় করা হয়েছিল।

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানায়, গতকাল শুক্রবার সকালে আমিরাত উপকূলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দুবাইভিত্তিক সাংবাদিক নাতাশা তুরাক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর স্থাপনা রয়েছে, সেসব জায়গায় বিস্ফোরণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যখন হরমুজে এসব উপকূলবর্তী এলাকাজুড়ে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে, তখন আমিরাত উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। এ ধরনের হামলা গত সোমবার থেকে শুরু হয়।’ তবে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে হামলা হলেও আমিরাতের মূল ভূখণ্ডে কোনো ধরনের মিসাইল বা ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেনি।

বিজয় সুনিশ্চিত, হরমুজ প্রণালী শুধুই ইরানের : ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ ঘোষণা করেছেন যে, জাতি (ইরান) খুব শিগরিগিই বড় ধরনের বিজয় উদযাপন করতে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, জনগণের এই বিজয়ের মাধ্যমেই ইরানের ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা সব নিষেধাজ্ঞা ও চাপ অপসারিত হবে। জাতীয় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি এবং শিপিং লাইনস পরিদর্শনের সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ ইরানের একচ্ছত্র অধিকার এবং এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই থাকবে।

আরিফ স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কোনো আধিপত্য চায় না, বরং এই এলাকাকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা চায়। তবে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেই এই জলপথ নিরাপদ থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

পরিদর্শনকালে তিনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ওষুধ কারখানায় হামলার তীব্র নিন্দা জানান। দেশীয় প্রযুক্তির ওপর ভর করে ক্ষতিগ্রস্ত সব শিল্প ও স্বাস্থ্য স্থাপনা দ্রুত পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনেরও ঘোষণা দেন তিনি।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা -চুক্তি হলেও হরমুজের নিয়ন্ত্রণ চিরকাল ইরানের কাছেই থাকবে : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি হলেও ‘হরমুজ প্রণালি’ চিরকাল ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জ্বালানি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপদেষ্টা আমোস হোচস্টাইন। খবর মিডেল ইস্ট আইর। ব্লুমবার্গের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বাস্তবসম্মত ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর থেকে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। হোচস্টাইন সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো চুক্তির কাগজে জলপথ উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করবে, কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো তা বিশ্বাস করবে না; কারণ তারা জানে এই পয়েন্টে ইরানের হাতে কার্যত ‘ভেটো’ ক্ষমতা রয়েছে।

বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চললেও ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে পুনরায় বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই উত্তেজনার প্রভাবে বর্তমানে কুয়েত ও বাহরাইনের তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এবং কাতার তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতে জুন পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজার’ বা জরুরি অবস্থা জারি করেছে। তবে সৌদি আরব ও আমিরাত বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিক তেল রপ্তানি সচল রাখতে পেরেছে। ইরাকও সিরিয়া ও তুরস্কের মাধ্যমে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে।

হোচস্টাইন আরও জানান, বিশ্ববাজারে তেলের প্রকৃত দামে বিশাল অসংগতি দেখা দিয়েছে। কাগজে-কলমে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১১০ ডলার দেখালেও বাস্তবে তা ১৫০ থেকে ১৭০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মতো দরিদ্র দেশে এই দাম ব্যারেল প্রতি ২৮৬ ডলারে পৌঁছেছে।

তিনি সতর্ক করেছেন যে, দরিদ্র দেশগুলোতে শুরু হওয়া এই চরম জ্বালানি সংকট পর্যায়ক্রমে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড হয়ে জাপান, কোরিয়া এবং শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোতেও হানা দেবে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইরানকে এড়িয়ে বিকল্প অবকাঠামো গড়ার দিকে ঝুঁকছে।

সিআইএ’র রিপোর্ট -ট্রাম্পের নৌ-অবরোধে আরও কয়েক মাস টিকে থাকতে পারবে ইরান : মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একটি গোপন বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আগে ইরান অন্তত আরও তিন থেকে চার মাস মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে। এ সপ্তাহে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট চারজন ব্যক্তি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া আশাবাদী বক্তব্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণের পরও ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ অক্ষত রাখতে পেরেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনও ইরানের হাতে প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার পুনরায় সচল করেছে এবং নতুন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে। অন্যদিকে, গত বুধবার ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির হাতে আগের তুলনায় খুব অল্প অস্ত্র অবশিষ্ট আছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা চলমান সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, তেহরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর কিংবা হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার মতো ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মানেনি।

ট্রাম্প নৌ-অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি ভেদ করা কারও পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, অবরোধের কারণে খুব শিগগিরই ইরানের প্রধান তেল টার্মিনালগুলো পূর্ণ হয়ে যাবে এবং দেশটির তেল অবকাঠামো স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন আরও বেশি অনড় ও কৌশলী অবস্থানে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, তেহরান বিশ্বাস করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যের চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।

এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনার অন্তত ২২৮টি অবকাঠামো বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেছেন, নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে। তার ভাষায়, সামরিক অভিযানের পর এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা চলছে।

তবে সিআইএ’র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ৯০ থেকে ১২০ দিন বা তারও বেশি সময় অবরোধ মোকাবিলা করতে সক্ষম হতে পারে। বর্তমানে দেশটি অবিক্রিত তেল খালি ট্যাঙ্কারে সংরক্ষণ করছে এবং তেলের কূপ সচল রাখতে উৎপাদন সীমিত করেছে। একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার রেলপথ ব্যবহার করে তেল পাচারের মাধ্যমে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলারও চেষ্টা করছে তেহরান।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কম খরচের ড্রোন বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ এসব ড্রোন সহজে তৈরি ও গোপনে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তেল আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, একটি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলাই আন্তর্জাতিক বীমা সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ অবরোধও হয়তো ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবে না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত