ঢাকা শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চেম্বার আদালতে স্টে পায়নি রাষ্ট্রপক্ষ

চেম্বার আদালতে স্টে পায়নি রাষ্ট্রপক্ষ

সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ-সংবলিত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। এই আপিল শুনানির জন্য আগামী ৯ জুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এ শুনানি হবে। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব গতকাল বৃহস্পতিবার এই তারিখ নির্ধারণ করেন।

মূল আপিলে হাইকোর্টের রায় বাতিল চাওয়া হয়েছে। এর আগে মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবীর করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিষয়ে বলা আছে। এতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টি রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সেভাবে সংবিধানে পুনর্বহাল হবে বলে হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে। এ ছাড়া সংবিধান ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা জড়িত থাকায় আপিল করার জন্য সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছিলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ। এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে, যা আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আজকের কার্যতালিকায় ৩৮ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। পাশাপাশি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক শুনানিতে ছিলেন। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায়ে চেম্বার আদালত স্থগিতাদেশ দেননি। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আগামী ৯ জুন শুনানির জন্য নির্ধারণ করেছেন চেম্বার আদালত।

বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করাটা ‘চপেটাঘাত’-জামায়াত : বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের ওপর ‘চপেটাঘাত’ করা হয়েছে’ বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি বলেছে, ‘এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ‘আস্থা ও আত্মবিশ্বাস’ তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ অবস্থান তুলে ধরেন দলের কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সদস্য শিশির মোহাম্মদ মনির। গত ৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয় জাতীয় সংসদ। এরপর গত মঙ্গলবার বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেয় সরকার।

বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপকে পরের দিন ‘আদালত অবমাননা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন শিশির মনির। ৭ জুনের মধ্যে সরকার আপিল না করলে হাই কোর্টে আইনি লড়াই শুরুর ঘোষণাও দেন এ আইনজীবী। এরই ধারাবাহিকতায় এবার বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে জামায়াতের হয়ে সংবাদ এলেন শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘এর মধ্যদিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথরুদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের ভাষায়, এটা স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য কালোদিন হয়ে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে আমাদের বিচার বিভাগ সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে উচ্চ আদালত ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেন। সেই নির্দেশনার আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়।’ জামায়াতের এই আইনজীবী বলেন, বিচারকদের নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএস) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে আমাদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয়। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের সেই রায়ে বলা হয়, ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর আলোকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বিচার বিভাগের দুটি অংশ রয়েছে, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। আর নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ একসময় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে হতো। পরে সেখান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) নামে একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে এ কাজটি করা হয়ে থাকে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে মানা হয়। কিন্তু তাদের ছুটি, তাদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার সবগুলো ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। ‘ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারকরা কোনো আদেশ দিলে তাদের বদলি করে দেন, পদোন্নতি দেন না কিংবা শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ আনা হয়।’ জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরে শিশির মনির বলেন, বদলি, ছুটি পদোন্নতি আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা উচিত নয়, তা পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত