
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে একযোগে ১৫ জন মানুষকে নদীপথে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ ইনের (অনুপ্রবেশ) এক অপচেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তাৎক্ষণিক, অত্যন্ত সাহসী ও কঠোর অবস্থানের মুখে ভারতীয় বাহিনীর সেই অবৈধ প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার মধ্যরাতের দিকে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন রোকনপুর বিওপি এলাকার দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তে এই ঘটনা ঘটে। বিএসএফ সদস্যরা নদীপথ ব্যবহার করে একটি নৌকাযোগে ওই ১৫ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। ওই সময় পুশইনের শিকার হতে যাওয়া ব্যক্তিরা সীমান্তের শূন্যরেখা (জিরো লাইন) সংলগ্ন ভারতের অভ্যন্তরীণ অংশে অবস্থান করছিলেন।
অবৈধ পুশইনের বিষয়টি টের পেয়ে রোকনপুর বিওপির বিজিবি জোয়ানেরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কৌশলগত অবস্থান নেন। সীমান্তে তাৎক্ষণিকভাবে কড়া নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সর্বোচ্চ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর ফলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অবশেষে বিজিবির অনমনীয় ও দৃঢ় অবস্থানের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় ভারতীয় বাহিনী। বিএসএফের কোটালপুর ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্ত পিলার ২২০/এমপি সংলগ্ন ভবানীপুর এলাকা দিয়ে ওই ১৫ জনকে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজিবি নিশ্চিত করেছে যে, পুশ ইনের অপচেষ্টা চালানো ওই ১৫ জনের দলের মধ্যে ২ জন পুরুষ, ৮ জন নারী এবং ৫ জন অবুজ শিশু ছিল।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম সংবাদমাধ্যমকে জানান, বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা পুশ ইনের মতো ঘটনা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে সীমান্তজুড়ে বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করতে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে সীমান্তে জনসচেতনতামূলক মাইকিং করার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ এবং সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের সক্রিয় সহযোগিতায় রাতের বেলার বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশ ইন ও পারাপার পুরোপুরি বন্ধ করতে বিজিবির এই কঠোর নজরদারি আগামী দিনগুলোতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে।
লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ করল বিজিবি ও স্থানীয়রা: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশ ইন’ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার আমঝোল সীমান্তের ৯০৬ নম্বর প্রধান পিলারের ৮ নম্বর সাব-পিলার সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে আমঝোল সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার গেটের কাছে ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তিকে একটি গাড়িতে করে নিয়ে আসে বিএসএফের ৭৮ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, তাদের জোর করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়। সীমান্তে বিএসএফের এমন অস্বাভাবিক তৎপরতা টের পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীদের একত্রিত করেন। তারা স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পকে বিষয়টি জানান এবং খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা দেখে তারা গ্রামবাসীদের জড়ো করেন। পরে কয়েকশ গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা শূন্যরেখায় যৌথভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ তাদের পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসে। একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের শূন্যরেখা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এই পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, সীমান্তে যেকোনো ধরনের পুশ ইন, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সীমান্তের শূন্যরেখায় রাত কাটল ১২ জনের : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ক্ষেতের আইলে রাত কাটল পুশইনের চেষ্টার শিকার ১২ নারী-শিশু ও পুরুষের। এদের মধ্যে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাথানপাড়া গ্রামের মৃত ওয়াসেদ আলীর ছেলে উজির আলী (৫০), তার স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), বড় ছেলে শিহাদ (১৭), মেজো ছেলে ইনজামুল (৮) এবং আড়াই বছরের শিশু সামাদ (২)।
এছাড়া সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার রফিকুল গাজীর পরিবারের তিন সদস্য এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আফরোজা খাতুনের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। তারা সবাই নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তার স্বপক্ষে তারা কোন বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তবে পুশইনের একদিন পেরিয়ে গেলেও তাদের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কয়েক দফায় পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানালেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাতে সাড়া দেয়নি।
গত শুক্রবার ভোর পাঁচটায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে সে চেষ্টা প্রতিহত করেন বিজিবি ও স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা নীল চাঁদ বলেন, দুই দেশের সীমান্ত পিলার ১৪৮/৩ এস। এই পিলার থেকে ভারতীয় ৫০ গজের মধ্যে একটি পাটক্ষেতের আইলে শিমুলগাছের তলায় বসে আছেন ১২ জন। রোদে পুড়ে তারা ক্লান্ত।
নারীরা কাঁদছেন, শিশুরা প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। এর মধ্যে ১০ মাস থেকে ৪ বছরের শিশু আছে। এক নারী অন্তঃসত্ত্বা। তিনি কৌশলে কিছু বিস্কুট, পাউরুটি, দুধ, কলা ও পানি তাদের কাছে দিয়ে এসেছেন। রাতেও খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। এ বিষয়ে গত শনিবার সকালে বিজিবির প্রাগপুর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জামান বলেন, শূন্যরেখার ভারতীয় ৫০ গজের মধ্যে ওই ১২ জন পাটখেতের আইলে এখনো বসে আছেন। সেখানেই তাদের রাত কেটেছে। গতকাল শনিবার পতাকা বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা আছে। দেখা যাক কী হয়। শুক্রবারও দুবার পতাকা বৈঠকের সময় নির্ধারিত ছিল। তবে তাতে কোনো সাড়া দেয়নি বিএসএফ। বিজিবি বলছে, সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে আছেন তাদের সদস্যরা। সেখানে বাংলাদেশ প্রান্তে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও পুশইন ঠেকাতে সহযোগিতা করছেন।