
ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে আসর শুরু করা ব্রাজিল নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি মরক্কোর বিপক্ষে। মাঝেমধ্যে ঝলক দেখালেও বেশিরভাগ সময়ই লাতিন আমেরিকার দলটি ছিল নিষ্প্রভ। অপরদিকে আত্মবিশ্বাসী শুরুর পর দুর্দান্ত এক পাল্টা আক্রমণে ইসমায়েল সাইবারির গোলে এগিয়ে যায় মরক্কো। আফ্রিকার প্রতিনিধিরা দুর্দান্ত ফুটবল খেলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চাপে রাখে ম্যাচের বড় একটা সময়। শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ এক গোল ব্রাজিলকে বাঁচালেও মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে, তারা আর শুধু ‘চমক’ নয়, বিশ্ব ফুটবলের বড় শক্তিগুলোর জন্য বাস্তব হুমকি। বাংলাদেশ সময় গতকাল রোববার ভোরের যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘সি’র ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় মরক্কো। সেই দাপট ধরে রেখে ফেভারিটদের চমকে দিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা!
ম্যাচের শুরু থেকেই বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং সংগঠিত দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে মরক্কো। আক্রমণে আশরাফ হাকিমি ও বিলাল এল খান্নুসের গতি এবং সৃজনশীলতা ব্রাজিলকে বারবার সমস্যায় ফেলে। অন্যদিকে ব্রাজিল শুরুতে অনেকটাই পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করে খেলতে থাকে।
মধ্যমাঠে মরক্কোর আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণ আয়ুব বুয়াদ্দি অসাধারণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণ গড়ে বারবার ব্রাজিলের মাঝমাঠকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। দুই লাইনের মাঝখানে তৈরি হওয়া ফাঁকগুলো কাজে লাগিয়ে মরক্কো সহজেই আক্রমণে উঠে আসে। অপরদিকে নেইমারকে ছাড়াই মাঠে নামা ব্রাজিল শুরুতে কিছুটা ছন্নছাড়া ফুটবল খেললেও ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে ইগর থিয়াগোর সামনে গোলের ভালো সুযোগও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তিনি সেটি কাজে লাগাতে পারেননি। ঠিক এমন সময় ২১তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের চমৎকার পাস থেকে গোল করে মরক্কোকে এগিয়ে দেন ইসমাইল সাইবারি।
গোল হজমের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় ব্রাজিল। ৩২তম মিনিটে বাম দিক থেকে ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে বক্সে ঢুকে শক্তিশালী শটে গোল করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো চেষ্টা করেও সেই শট ঠেকাতে পারেননি। ব্রাজিলের জার্সিতে এটি ভিনিসিয়ুসের ৫০তম আন্তর্জাতিক গোল। দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই সতর্ক ফুটবল খেলেছে। রক্ষণ সামলে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও কোনো দলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়তে হয়েছে ব্রাজিল ও মরক্কোকে।
ড্র করলেও বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের অপরাজিত থাকার রেকর্ড অক্ষুণ্ন রয়েছে। ১৯৩৮ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারেনি সেলেসাওরা। তবে মিশন হেক্সার পথে প্রথম ম্যাচে পূর্ণ তিন পয়েন্ট না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা নিয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে হলো আনচেলোত্তির শিষ্যদের। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করা মরক্কো আবারও দেখিয়েছে যে বড় দলগুলোর জন্য তারা কতটা কঠিন প্রতিপক্ষ। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট দলটি ব্রাজিলকে সমানে টক্কর দিয়ে তুলে নিয়েছে মূল্যবান এক পয়েন্ট।
মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরও বিচলিত নন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও তিনি মনে করেন, একটি ম্যাচ দিয়েই পুরো টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। তাই দলকে নিয়ে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি নিজের দলের দুর্বলতা আড়াল করার চেষ্টা করেননি। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের শুরুটা ভালো হয়নি, দল কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল। ফলে আমরা বল হারিয়েছি এবং অনেক ডুয়েলেও হেরেছি। প্রথমার্ধ ভালো ছিল না, কিছুটা উন্নতি হয় দ্বিতীয়ার্ধে। এটি কঠিন ম্যাচ ছিল, কারণ মরক্কো বেশ ভালো দল।’
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের মতো দলের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করেছে-আনচেলত্তির এই স্বীকারোক্তিই যেন ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। কারণ তার দলকে দেখে সত্যিই মনে হয়েছে তারা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল মনে হয়। শুরুর দিকেই সেই চাপ কমিয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠত পারত। একইভাবে ম্যাচ আরও নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারত আমাদের।’ যদিও ফলাফলকে একেবারে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না তিনি। বরং বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলায় এটিকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেই গ্রহণ করতে চাইছেন। সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি বলেন, ‘আমিও উদ্বিগ্ন ছিলাম, আমরা বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি, মাঠে দলকে কিছুটা ভারসাম্যহীনও মনে হয়েছে। পরের ম্যাচে দল ভালো করবে। প্রথমার্ধে অনেক সমস্যা ছিল, পা থেকে বল হারিয়েছি। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে। আমাদের আত্মবিশ্বাস হারানো চলবে না। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যেকোনো কিছুই হতে পারে। প্রথম ম্যাচেই আপনি বিশ্বকাপ জিততে পারবেন না। তবে ফলাফল একেবারেই খারাপ নয়, তবে আমরা পরের অংশে আরও ভালো লড়ব।’
মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল তরুণ ফরোয়ার্ড এন্ড্রিক ফেলিপেকে মাঠে না নামানো। বিশ্বকাপের আগে প্রীতি ম্যাচে গোল করা এই স্ট্রাইকারকে বদলি হিসেবেও ব্যবহার করেননি আনচেলত্তি। তবে এ নিয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি তিনি। তার বদলে পুরো দলের পারফরম্যান্সের দিকেই নজর রাখতে বলেছেন ব্রাজিল কোচ। ‘আমি সুনির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড় নিয়ে কথা বলব না। আমি দলগত বিষয়ে কথা বলব। প্রথমার্ধে দল ভালো খেলেনি, দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ভালো ছিল পারফরম্যান্স। তখন আমাদের কিছু সুযোগ তৈরি হয়। তবে আমাদের আরও উন্নতি প্রয়োজন।’
তবে হতাশার ম্যাচেও একটি বড় ইতিবাচক দিক পেয়েছে ব্রাজিল। সেটি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পারফরম্যান্স। গোলের পাশাপাশি পুরো ম্যাচেই মরক্কোর রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন এই ফরোয়ার্ড। শিষ্যের প্রশংসায় আনচেলত্তি বলেন, ‘সে খুব ভালো খেলেছে, অনেক ভয়ঙ্কর ছিল মাঠে। তার সব গুণাবলি আছে বলে আমার বিশ্বাস। ওর দারুণ একটি বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে।’ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের অবস্থান তাই দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। একদিকে হার এড়ানোর স্বস্তি, অন্যদিকে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়ার উপলব্ধি। আনচেলত্তির কথাতেও সেই বার্তাই স্পষ্ট-এই ব্রাজিল এখনও প্রস্তুতির পথে, আর বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রায় তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়তো এই মুহূর্তে অন্য কোনো দল নয়, নিজেদের অসম্পূর্ণতাই! ’
এদিকে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিলকে পয়েন্ট এনে দেওয়া ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সতীর্থদের বল দখলে রাখার তাগিদ দিয়েছেন। কোচ কার্লো আনচেলত্তির মতো এই তারকা ফরোয়ার্ডও বলেছেন, এগিয়ে যেতে হলে খেলায় উন্নতি করতে হবে তাদের। ব্রাজিলের সমতাসূচক গোলদাতা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও ম্যাচের শুরুটা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। শুরুতেই নিজেদের ছন্দ খুঁজে না পাওয়ার মূল্য দিতে হয়েছে দলকে বলেন তিনি, ‘আমরা ম্যাচটা খুব খারাপভাবে শুরু করেছি। প্রথম গোল হজম করার পর আবার খেলায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে যায়। এটি প্রথম ম্যাচ, তাই এমন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।’
তবে ভিনিসিয়ুসও বিশ্বাস করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিল আরও ভালো খেলবে। ‘আমাদের উন্নতি করতে হবে এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ প্রতিযোগিতা তো এখনই শুরু হয়েছে। এটি বিশ্বকাপ, এখানে কোনো সহজ ম্যাচ নেই,’ বলেন তিনি। ম্যাচ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিজের দলের ঘাটতির কথাও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড, ‘এ মুহূর্তে খুব বেশি কিছু বলার নেই। আমাদের শুধু আরও উন্নতি করতে হবে।’
গত বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়া মরক্কোকে এবার আরও দূরে দেখতে চান মোহামেদ ওয়াহবি। ব্রাজিলের বিপক্ষে ড্র করে খুশি এই কোচ বললেন, উত্তর আমেরিকা আসরে নিজেদের ফুটবলের ইতিহাস নতুন করে লেখার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। ম্যাচ শেষ কোচ বললেন, শেষ চারের গণ্ডি পেরিয়ে সামনে যেতে ক্ষুধার্ত তিনি ও তার দল। ‘মরক্কোর ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী।
ড্র করেই আমরা খুশি। আমি হতাশ নই। অবশ্যই আমরা জিততে চেয়েছিলাম, তবে আমার খারাপ লাগছে না। যা নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত তা হলো—চাপের মুখেও বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সাহসিকতার সঙ্গে খেলার মানসিকতা আমাদের আছে। এটা আমাদের দলের একটি বড় গুণ। আমি সেমি-ফাইনাল পেরিয়ে আরও সামনে যেতে চাই। তবে আজকের ম্যাচটি ভালো ছিল। আপাতত এক পয়েন্টই যথেষ্ট, আমরা আরও উন্নতি করব।’ ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচে গ্যালারিতে ছিল হলুদের ঢেউ। তার মাঝে থেকেই মরক্কোর সমর্থকরা যেভাবে দলকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তা মনে ধরেছে ওয়াহবির। ভক্তদের ভালো একটি ম্যাচ উপহার দিতে পেরেছেন বলে মনে করছেন তিনি। ‘জানি না, ২০ শতাংশ দর্শক মরক্কোর ছিল কিনা, তবে তাদের গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। যদি সংখ্যাটা শুধু ২০ শতাংশ হয়, তবে তারা আমাকে বোকা বানিয়েছে- আমার মনে হচ্ছিল স্টেডিয়ামে আমাদের সমর্থক অনেক বেশি। আশা করি, আজ রাতে একটি দুর্দান্ত ম্যাচ উপভোগ করে তারা আনন্দ পেয়েছে এবং এই ধারা সামনেও বজায় থাকবে।’
বাংলাদেশ সময় আগামী শনিবার সকালে পরের ম্যাচে হাইতির মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। ওই দিনই ভোরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে মরক্কো।
বিশ্বকাপে আজকের ম্যাচ (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী)
আইভরি কোস্ট বনাম ইকুয়েডর : ভোর ৫টা
সুইডেন বনাম তিউনিসিয়া : সকাল ৮টা
স্পেন বনাম কেপ ভার্দে : রাত ১০টা
বেলজিয়াম বনাম মিসর : রাত ১টা (১৬ জুন)
সৌদি আরব বনাম উরুগুয়ে : ভোর ৪টা (১৬ জুন)