
ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ শেষে এক সাংবাদিককে পিটুনি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলার শিকার মাহফুজুর রহমান শিশির দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আহত হয়েছেন দ্য নিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ হোসেনও। এছাড়া অন্তত ১০ জন সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর ধানমন্ডি জোনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শেষে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পাঁচজন সাংবাদিক জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কলাবাগান থেকে মিছিলটি বের হয়ে সোবহানবাগ মসজিদ এলাকা ঘুরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে এসে শেষ হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত ওই কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশ চলাকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
হামলার শিকার মাহফুজুর রহমান শিশির বলেন, ‘সমাবেশে একাধিক নেতা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কয়েকজনের বক্তব্য দিলে সংবাদ সংগ্রহে সুবিধা হবে বলে অনুরোধ করা হয়। তখন একজন বক্তা বলেন, ‘সবার বক্তব্যই নিতে হবে, না হলে চলে যেতে হবে’। ‘আমি এর প্রতিবাদ করে বলি, ‘আমাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমরা তো আপনাদের কর্মী নই’। এরপরই আমাকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়।’
ভুক্তভোগী এ সাংবাদিক বলেন, তাকে রাস্তায় ফেলে কিল, ঘুষি ও লাথি মারা হয়েছে। পরে অন্য সাংবাদিকরা তাকে উদ্ধার করে কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা শেষে তাকে বাসায় পাঠানো হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিশিরের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার এক রুমমেট বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে ফেরার পর শিশির বিশ্রাম নিচ্ছে। তার নাক ও ঠোঁটে আঘাত লেগেছে। চিকিৎসকরা তাকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন।’
দ্য নিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ হোসেন বলেন, ‘শিশিরকে রক্ষা করতে গিয়ে আমরাও হামলার শিকার হই। জামায়াতের নেতাকর্মীরা দুই দফায় সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তারা শিশিরকে তুলে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেছিল।’
সাংবাদিক মারুফের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি। আনন্দবাজারের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার জোবায়ের হোসেনেও ভাষ্য, ‘জামায়াতের নেতাকর্মীরা খুবই আগ্রাসী আচরণ করছিল। তারা শিশিরকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।’
জানতে চাইলে ধানমন্ডি থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা অবগত নই।’ মিছিল ও সমাবেশের ভিডিওতে স্থানীয় জামায়াত নেতা মুস্তাফিজুর রহমান, মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন, আনিসুজ্জামান ও জাহিনুর রহমানকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ধানমন্ডি থানা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মুজিবুর রহমান খান ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বহিরাগত কেউ ঢুকে পড়ে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।’ এ বিষয়ে দলের বক্তব্য জানতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দের সঙ্গে ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াতের দুঃখ প্রকাশ, তদন্ত কমিটি : রাজধানীর ধানমন্ডিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে’ সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে একটি ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে দলটি। গতকাল মঙ্গলবার দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর। জামায়াতে ইসলামীর কোনো স্তরের জনশক্তি স্বাধীন সাংবাদিকতায় কখনও বাধা সৃষ্টি করেনি, আগামীতেও করবে না। আজ ধানমন্ডিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে ওই ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো জনশক্তি জড়িত থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জামায়াতের প্রোগ্রামে গুপ্তচর কেউ এমন ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা- সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া এই ঘটনায় ধানমন্ডি জোন পরিচালক ও মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক নুর নবী মানিককে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া এই কমিটিকে আগামীকালের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘আজ রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার যে অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, আমরা তার জন্য আন্তরিকভাবে গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি।’ অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির আহত হয়েছেন। আমি তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি এবং তার প্রতি গভীর সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছি। ‘ভবিষ্যতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জামায়াতে ইসলামী আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। আমরা আবারও এই অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিচার দাবি ছাত্রদলের : রাজধানীর ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর ওপর জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, সকালে ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় ‘দৈনিক সকাল’র মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির, ‘যমুনা টেলিভিশন’র সিনিয়র রিপোর্টার রাব্বী সিদ্দিকী এবং ‘কালবেলা’র সংবাদকর্মী আব্দুর রহমান ইশানসহ বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর ওপর জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা হামলা ও লাঞ্ছনা চালান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে ছাত্রদল জানায়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরও ২০ থেকে ২৫ জন সংবাদকর্মীও হামলার মুখে পড়েন এবং লাঞ্ছিত হন। যৌথ বিবৃতিতে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো যে কোনো স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের পরিপন্থি। তারা বলেন, বিরোধীদলে থাকতেই জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা প্রকাশ্য দিবালোকে কর্তব্যরত সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান শিশির, রাব্বী সিদ্দিকী ও আব্দুর রহমান ইশানসহ প্রায় ২৫ জন সংবাদকর্মীর ওপর যেভাবে হামলা ও লাঞ্ছনা চালিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।