ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশ-চীন ১৩ সমঝোতা

* গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা * তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ চীনের ঐকমত্য * পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হতে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর * প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ * আজ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তারেক রহমান
বাংলাদেশ-চীন ১৩ সমঝোতা

বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘১৩টি মোমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিংয়ের মধ্যে রয়েছে- ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কীভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্লানের বিষয়ে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কীভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি- সেটি নিয়ে কথা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমইউ হয়েছে। একই সাথে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটা ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্লান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঠালের রপ্তানি বিষয়ে একটা এমইউ হয়েছে।’

মাহ্দী আমিন বলেন, ‘একই সাথে চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছিৃআমাদের স্কুল কারিকুলামের সেটি এবং টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনে কো-আপরেশনে দুটো পৃথক এমইউ হয়েছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে দুই দেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কীভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজ পেপারের ভেতরে চারটা এমওইউ হয়েছে।’

বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বোর্ড বিডার সাথে এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে আমাদের চিটাগাংয়ের আনোয়ারাতে এবং মোংলাতে কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে আমরা কীভাবে বাংলাদেশের নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং তার মাধ্যমে এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি, সেগুলো নিয়ে পৃথক এমইউ হয়েছে।’

এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্বারক সই হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সমঝোতায় সই করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং এই সমঝোতায় সই করেন। সমঝোতার আওতায় দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগনের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এ নেতা।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হল অব পিপলে পৌঁছান। সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। ওই সফরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে সোমবার তিনি পৌঁছান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়।

আজ গ্রেট হল অব পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।

গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। তিনি গতকাল বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানান। শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা দিয়ে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যান লি কিয়াং। অভিবাদন মঞ্চে তারেক রহমান ও লি কিয়াংকে সশস্ত্র সালাম দেয় চীনের সশস্ত্র বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল। এ সময় দু’দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিবাদন জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।

তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীনের ঐকমত্য : তিস্তাসহ দেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে বাংলাদেশ ও চীন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং। এতে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন। জবাবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সই করা সমঝোতা স্মারক এবং গত বছর চীনের পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর।’

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে চীন সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।’ তিনি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ এবং এই খাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের আহ্বান জানান।

বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হতে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আজ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে সেবা দিয়ে সহায়তা করতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এরইমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তারা আমাদের জনগণের কর্মক্ষমতা, আমাদের সহনশীলতা এবং আমাদের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পারেন। তারা বলতে পারেন বাংলাদেশ সফল হতে পারে।’

তারেক রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার জন্য আরও বেশি চীনা কোম্পানির দেশটিতে আসা উচিত। তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘তাদের বিনিয়োগ যথাযথ মূল্যায়ন পাবে, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং আরও গতিশীল ও সংবেদনশীল বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারি, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।’

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চীন এখন বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের আরও উচ্চস্তরে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনা কোম্পানিগুলো উন্নত উৎপাদনশিল্প, উচ্চমূল্যের অবকাঠামো এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে।’ তিনি বলেন, ‘চীন যখন শিল্প ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আরও উচ্চ ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্যের সন্ধান করবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা তাদের বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারি। এটি একটি পরিপূরক, বাস্তবধর্মী এবং উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সম্পর্ক। তবে কথার সঙ্গে কাঠামোগত পদক্ষেপেরও মিল থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনতে একটি কঠোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সরাসরি আমলাতান্ত্রিক জড়তাকে মোকাবেলা করছি। স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং গতি বাড়ানোর জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা উন্নত করছি, একাধিক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হ্রাস এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে ডিজিটাইজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও লভ্যাংশ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছি। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল।’ তিনি বলেন, ‘এসব অঞ্চলে উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা, সমুদ্রবন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আরও আস্থা, সুস্পষ্ট সুরক্ষা ও আধুনিক বিনিয়োগ কাঠামো প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি হালনাগাদের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিডা এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক চালু করেছে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যাতে তারা বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, প্রণোদনা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজে তথ্য পেতে পারেন।’

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশে প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা আরও কাছে থাকতে, আরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে এবং বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজের জন্যে আপনাদের সাহায্য করতে চাই।’

তারেক রহমান বলেন, ‘সরকার সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নেও জোর দিচ্ছে। নতুন লাইসেন্স অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার ফলে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে আরও সহজে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে তা নিশ্চিত করা।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাবি করব না যে সবকিছুই নিখুঁত। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত, সেগুলোর সমাধানে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও সেগুলোর সমাধান অব্যাহত রাখব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, এই ফোরাম থেকে আমরা একটি অভিন্ন সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাই। যাতে এ অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায়।’

ভাষণের শেষে তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশে আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন। সমমর্যাদার এক প্রকৃত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করি।’

অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও প্রণোদনা নিয়ে একটি বিশেষ উপস্থাপনা তুলে ধরেন। সম্মেলনে ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের শুরুতে লিউ হাইশিং তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় অভিনন্দন জানান। পাশাপাশি তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নয়বার চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার চীন সফরের ছবি তাঁর সম্মানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

লিউ হাইশিং বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কথা উল্লেখ করে দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দৃঢ় সমর্থক। পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপরও তিনি জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তিনি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহ্য (লিগ্যাসি) ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ আরও উন্নত জীবন লাভ করবে বলে তিনি আশাবাদী।

বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদি আমিন এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার সান হাইয়ান, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আজ চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তারেক রহমান : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় তাঁরা সাক্ষাৎ করবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের শেষ দিনে শুক্রবার (আজ) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে।’ তিনি বলেন, চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবেন, ইনশাআল্লাহ।

আগামীতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর হবে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আমরা মনে করি।

চারদিনের চীন সফরে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুক্রবার বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন ২৪ জন।

এর মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- হুমায়ুন কবির, একেএম শামসুল ইসলাম, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, মাহদী আমিন। ‘শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সকালে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে গ্রেট হলে সাক্ষাৎ এবং চীনের জাদুঘর পরিদর্শন। বিকেল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর সফরসঙ্গিরা।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ জুন দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি সফর।

প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় দুইদিনের সফর শেষে গত সোমবার রাতে প্রথমে যান চীনের দালিয়ান। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেন। তিনি দুই দিনের বিভিন্ন কর্মসূচি শেষ করে বুধবার বিকালে দালিয়ান থেকে হাই স্পিড (বুলেট ট্রেন) ট্রেনে বেইজিং আসেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের এটি প্রথম চীন সফর। এরআগে তারেক রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে ২০০১ সালে চীন সফর করেছিলেন। তিনি ওই সময়ে এই গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীর লালগালিচা সংবর্ধনাতেও উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত