
চার বছর আগে শিরোপা জয়ের মধ্যে দিয়ে কাতারে একটি সফল বিশ্বকাপ মিশন শেষ করেছিল আর্জেন্টিনা। এবার উত্তর আমেরিকায় যেন ঠিক সেখানে থেকেই শুরু করেছে আলবিসেলেস্তেরা। গ্রুপ পর্বে টানা দুই জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে লিওনেল মেসিরা। আজ ডালাসে ‘জে’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে মাঠে নামবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। নিয়মরক্ষার এই ম্যাচটি গ্রুপসেরা হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা। তবে আসল পরীক্ষা শুরু হবে নকআউট পর্বে। এই পর্বের প্রথম স্তর সেরা বত্রিশের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়া কেপ ভার্দে। যারা অবিশ্বাস্যভাবে কোনো ম্যাচ না জিতেই নকআউট পর্বের টিকেট নিশ্চিত করেছে। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে স্পেনের সঙ্গে ড্র এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে লড়াকু পারফরম্যান্সের পর সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপের রানার্সআপ হয়েছে আফ্রিকার দেশটি। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ কেপ ভার্দে। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলের এই দ্বীপপুঞ্জের জনসংখ্যা লাখ পাঁচেকের সামান্য বেশি।
ফিফা র্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বর দলটি এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই অপরাজিত। এবার তাদের সামনে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশ সময় আগামী শনিবার ভোর ৪টায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। ছোট এই দেশটির বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়াই ছিল বিস্ময়কর। বিশ্বকাপ ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে তারা যোগ্যতা অর্জন করেছিল। আর এখন তারা সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে পৌঁছে গেছে নকআউট মঞ্চে।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন, ৪৮ দলের বিশ্বকাপে নতুন ফরম্যাটের সুবিধা পেয়েছে তারা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আফ্রিকান বাছাইপর্বে নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কেপ ভার্দে। পেছনে ফেলেছে বিশ্বকাপে নিয়মিত মুখ ক্যামেরুনকে। প্লে-অফের ঝুঁকিতেও পড়তে হয়নি। এরপর বিশ্বকাপে নিজেদের গ্রুপেও দ্বিতীয় হয়েছে তারা। সেরা তৃতীয় দল হওয়ার অপেক্ষা করতে হয়নি! এবার তাদের সামনে আর্জেন্টিনা। কাগজে-কলমে ব্যবধান বিশাল। বাস্তবতাও সেটাই বলে- এখানেই হয়তো শেষ হবে কেপ ভার্দের স্বপ্নযাত্রা। কিন্তু এই দল এখন পর্যন্ত যা করেছে, তাতে ‘সম্ভব’ আর ‘অসম্ভব’-এর সীমারেখা বারবার মুছে গেছে।
অন্যদিকে কেপ ভার্দের এই সাফল্য যেন নতুন দরজাও খুলে দিয়েছে আর্জেন্টিনার জন্য। গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে এই প্রতিপক্ষ পাওয়ায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সামনে পথ এখন অনেকটাই মসৃণ মনে হচ্ছে। বত্রিশে কেপ ভার্দে চ্যালেঞ্জ জিতে শেষ ষোলোতে উঠতে পারলে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে অস্ট্রেলিয়া অথবা মিশর। অস্ট্রেলিয়া প্রতিপক্ষ হলে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সেই লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি হবে, যেখানে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা না গেলেও, গ্রুপ ‘কে’-এর শীর্ষ দল-কলম্বিয়া কিংবা পর্তুগালের মধ্যে কোনো একটি দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া নিজেদের গ্রুপে রানার্সআপ নিশ্চিত করা সুইজারল্যান্ডও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের তালিকায় রয়েছে। সব বাধা পেরোতে পারলে ফাইনালের আগে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও আসতে পারে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে থাকতে পারে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল অথবা শক্তিশালী ইংল্যান্ড। দুই দলই শিরোপার অন্যতম দাবিদার এবং তারকায় ঠাসা স্কোয়াড নিয়ে খেলছেন।
তবে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে অধিনায়ক লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফর্ম। প্রথম দুই ম্যাচেই দলের পাঁচটি গোলের সবকটিই করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছেন এবং আর্জেন্টিনাকে আগেভাগেই তুলে দিয়েছে নকআউট পর্বে! আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে দেখা যেতেই পারে মেসির আর্জেন্টিনাকে।
শেষ বত্রিশে কারা উঠল, বাদ পড়ল কারা : ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের অর্ধেক শেষ না হতেই নকআউট পর্বের চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ১২টি গ্রুপের মধ্যে ছয়টির খেলা শেষ হয়েছে। এরইমধ্যে ১৯টি দল রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করেছে। বাকি ১৩টি টিকিটের জন্য এখনও লড়াই করছে ২১টি দেশ। টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে উঠবে। পাশাপাশি ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও শেষ ৩২-এ খেলার সুযোগ পাবে। আগামী ২৮ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচগুলো।
শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে যে ১৯ দল : গ্রুপ ‘এ’ থেকে মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রুপ ‘বি’ থেকে সুইজারল্যান্ড, কানাডা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। গ্রুপ ‘সি’ থেকে ব্রাজিল, মরক্কো। গ্রুপ ‘ডি’ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ ‘ই’ থেকে জার্মানি, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর। গ্রুপ ‘এফ’ থেকে নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন। গ্রুপ ‘আই’ থেকে ফ্রান্স, নরওয়ে। গ্রুপ ‘জে’ থেকে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘কে’ থেকে কলম্বিয়া।
রাউন্ড অব ৩২ থেকে প্রতিটি ম্যাচই হবে সিঙ্গেল-এলিমিনেশন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, হারলেই বিদায়। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাচ ড্র থাকলে ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় খেলা হবে। এরপরও সমতা থাকলে টাইব্রেকারে নির্ধারিত হবে বিজয়ী দল।
শনিবার পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ৮টি দল : তুরস্ক, তিউনিসিয়া, হাইতি, পানামা, চেক প্রজাতন্ত্র, কাতার, কুরাসাও, জর্ডান। গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলো শেষে পূর্ণ হবে শেষ ৩২-এর লাইনআপ। এরপর শুরু হবে শিরোপার আসল নকআউট লড়াই।
অপেক্ষায় ইরান, জঘন্য বিশ্বকাপ বললেন অধিনায়ক : রাখঢাক না রেখেই ক্ষোভ ঝাড়লেন ইরান অধিনায়ক মেহদী তারেমি। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপে নিজেদের ভোগান্তির জন্য তিনি সরাসরি ফিফা ও আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। ইরানের সঙ্গে বিশ্বকাপে ‘অন্যায়’ করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারেমি। তার ক্ষোভের কারণটা কারও অজানা থাকার কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকেই মাঠের বাইরে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ইরানকে। তাদের মূল অনুশীলন ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বদলে নিয়ে যাওয়া হয় মেক্সিকোতে। এরপর কথা ছিল, প্রতিটি ম্যাচের দুই দিন আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে যাবে এবং ম্যাচের পরদিন মেক্সিকো ফিরবে। পরে ফিফা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে দিনে গিয়ে দিনে ফিরতে হবে ইরানকে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনার পর ফিফা জানায়, ম্যাচের আগের দিন এসে ম্যাচ শেষে তাদের আবার চলে যেতে হবে। ইরান দলের অনেক স্টাফ পাননি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাও।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খেলে যাওয়া ইরান মিসরের সঙ্গে জিতলেই ‘রাউন্ড অব ৩২’ নিশ্চিত করে ফেলত। শেষ মুহূর্তের গোলে ২-১ গোলে এগিয়েও গিয়েছিল তারা। কিন্তু অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। ভাঙে ইরানের স্বপ্ন! এরপরই মুখ খোলেন তারেমি। নিজের ক্ষোভ তিনি ঝেড়েছেন এভাবে, ‘এটা জঘন্য বিশ্বকাপ। ফিফার উচিত ছিল সব সমস্যার সমাধান করা। দুর্ভাগ্যবশত শুরু থেকেই তারা সেটি করতে পারেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, “এটি তো শুধু শুরু...।” অথচ আগামীকালই গ্রুপ পর্ব শেষ হতে যাচ্ছে। অথচ আমাদের লজিস্টিক দলের কোনো মানুষ এখানে নেই। কারণ, তাঁরা ভিসা পাননি।’
তারেমি আরও বলেন, ‘আমাদের কেন বারবার তিহুয়ানা থেকে যাতায়াত করতে হবে? আমরা তিহুয়ানার মানুষকে ভালোবাসি। মেক্সিকোকে ভালোবাসি। তারা খুবই বিনয়ী এবং আমরা তাদের পছন্দ করি। কিন্তু একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এমন একটি পেশাদার টুর্নামেন্টে এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না’।
ইরানের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে দাবি করে অধিনায়ক তারেমি বলেছেন, ‘এটি অন্যায়। আমাদের মতে, এটি চরম অবিচার। ফিফার কাছে কি এটা ন্যায়সংগত মনে হয়? ঠিক আছে, তাদের জন্য ভালো। তারা যদি চায় আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ে যাই, তাহলে ঠিক আছে; আমরা বাদই পড়ে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্য করার মতো কোনো লজিস্টিক স্টাফ এখানে নেই। আমরা এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না।’
ইরান বিশ্বকাপে থাকুক, এটি আদৌ চাওয়া হচ্ছে কি না-এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। লোকে কী চায়, আমি জানি না। তবে আমাদের দিক থেকে মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, তারা সম্ভবত এটাই পছন্দ করছে...তা না হলে ৯০ মিনিট খেলার পর আমাদের আবার তিহুয়ানায়ায় ফিরে যেতে হবে কেন?’
মিসরের সঙ্গে ড্র করার পর গ্রুপ পর্বে তৃতীয় হয়েছে ইরান। নকআউট বা শেষ বত্রিশের টিকিট পেতে হলে এখন তাদের বাকি ম্যাচের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দলগুলোর একটি হয়ে পরের পর্বে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে ইরানের। অপরদিকে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ম্যাচ ড্র হয়, উজবেকিস্তানকে হারায় ডিআর কঙ্গো এবং ঘানার সঙ্গে হার এড়ায় ক্রোয়েশিয়া তাহলে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাবে ইরান।