ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি বিরোধী দলীয় নেতার

* বিরোধী দলের বক্তব্য ‘কুচি কুচি করে কাটার যন্ত্র’ ফেলে দেওয়ার আহ্বান শফিকুরের * আদ্-দ্বীন হাসপাতাল খুলে দেওয়ার আহ্বান সংসদে
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি বিরোধী দলীয় নেতার

দেশের কওমি ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং দেশের যোগ্য সব নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া সংসদের বৈঠকের এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে বৈশ্বিক ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে পারছে না। ১৮ কোটি মানুষের দেশে অসংখ্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো সম্মানজনক অবস্থান নেই; বরং দেশ দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা মিশনের অভাব। দক্ষ ও যোগ্য মানুষকে মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক প্রাধান্য ও ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্যও বাজেটে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি অনুদান নিলে শিক্ষার মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ণ হবে কওমি ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন একটি আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত তাদের সম্মিলিত সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার (আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কাওমিয়া বাংলাদেশ) সঙ্গে বসে নিশ্চয়তা দেওয়া যে, তাদের পরামর্শ অনুযায়ীই এটি পরিচালিত হবে। তাহলে একটি পথ বের হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের যে হক রয়েছে, তা বুঝিয়ে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে জুলুম না করে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে মান যাচাই করে দ্রুত এমপিওভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের যোগ্য সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, উন্নত দেশের মতো বিত্তবানদের জন্য বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করা পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত।

তিনি পাহাড়ের অনগ্রসর ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ে আর কোনো দেশপ্রেমিক সেনা সদস্যকে প্রাণ হারাতে হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাধর্মী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট ও অতিরিক্ত তহবিল দিয়ে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেন, যাতে দেশ চিরকাল আমদানিনির্ভর না থেকে নিজস্ব পণ্য রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।

বিরোধী দলের বক্তব্য ‘কুচি কুচি করে কাটার যন্ত্র’ ফেলে দেওয়ার আহ্বান শফিকুরের : জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী-দুই দলকেই একে অন্যেকে সম্মান ও যৌক্তিক কারণে সহযোগিতা করার মানসিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

দেশের স্বার্থে তিনি সরকারি দলের প্রতি ‘একটি ওয়ান্ডারফুল কম্বিনেশন’ নিয়ে চলারও তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একটা চমৎকার টেনডেন্সি (প্রবণতা) আমি লক্ষ্য করেছি, সরকারি দলের প্রায় সকল বক্তাবিরোধী দলের বক্তব্য কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন। আসেন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা দেশটা চালাই। ওই কুচি কুচি করার যন্ত্রটা আসুন আমরা ফেলে দিই। আমরা একটা বিউটিফুল, ওয়ানডারফুল কম্বিনেশন নিয়ে চলি।

‘এর অর্থ এটি নয় যে সরকারি দলের যেটা অভিপ্রায়, বুঝে না বুঝে সেটাই হবে বিরোধীদলের অভিপ্রায়। আবার এর অর্থ এটিও নয় যে সরকারি দল সংগত কোনো বিষয় নিয়ে সামনে আগালে বিরোধীদল বিরোধিতার খাতিরে শুধু বিরোধিতাই করে যাবে- এই দুইটার কোনোটাই না। সরকারি দলকেও বিরোধীদলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সকল ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে। এই কথাটি আমরা প্রথম দিনেই বলে রেখেছি।’

গত সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির এসব কথা বলছিলেন।

এসময় আমির বলেন, ‘সরকারি দলকেও বিরোধীদলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে। বিরোধী দলকেও সরকারি দলসহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।’

স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের উদ্দেশ্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্পিকার, অতীত অভিজ্ঞতা আপনার আছে। আমার নেই। এখানে আরও কয়েকজন আছেন অতীতেও ছিলেন। আমরা বেশিরভাগই নবীন, আর নবীনদের অধিকার থাকে প্রবীণদের কাছ থেকে শেখার। কিন্তু আমরা মন্দটা শিখতে চাই না। আমরা শিখতে চাই ভালোটা। অতীতে এই সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা হওয়া উচিত নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা তোষামোদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা। দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জায়গা। দায়িত্ব পালন করা জায়গা। অনেক সময় ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আমরা বেশি করে আঘাত করি। আমি প্রথম দিন অনুরোধ করেছিলাম অতীতের ব্যাড কালচারকে আমরা না করি। এই সংসদে দাঁড়িয়ে চরিত্র হনন যেন না হয়।’

বক্তব্যের শুরুতে বিরোধী দলীয় নেতা ‘গভীর শ্রদ্ধা’র সঙ্গে স্মরণ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল এম এ জি ওসমানী, আ স ম আবদুর রবসহ সব শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের।

নব্বই গণআন্দোলন, ২৪ অভ্যুত্থানের শহীদ, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদদেরও স্মরণ করেন আমির। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি কষ্টে ভোগা দল। এক-দুই করে ১১ জনকে আমাদের বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ এ সময় বা দিকের আসনে উপবিষ্ট জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম দেখিয়েকে দেখিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘১২ নম্বর জন এখানে জীবিত আছেন।’

সংসদ সম্পর্কে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে আজকের এই পার্লামেন্ট গঠিত হয়েছে। এই পার্লামেন্ট মজলুমের পার্লামেন্ট। সংগত কারণেই আশা করি যে এই পার্লামেন্ট এমন কোনো আচরণ করবে না, যেটা মজলুম দেশবাসীকে আহত করে। এই পার্লামেন্ট দায়িত্বশীল আচরণ করবে, জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে, জাতিকে জাগিয়ে তুলবে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে।’

তিনি বলেন, ‘বাজেট বড় না ছোট, বাস্তবায়নযোগ্য বা এর সংখ্যাতাত্ত্বিক অনেক বিশ্লেষণ আছে। আমি সেদিকে যেতে চাই না।

এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই সংসদে আজকে আমরা যারা আছি, একসময় আমরা একদিকেই বসতাম। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ (সাল), অল্প দু-একজন বা দু-একটি দল ছাড়া। এখন আমরা দুই অংশে সংযুক্ত- আমি বিভক্ত বলছি না। কারণ, কোনো যানবাহনই এক চাকায় চলে না। যানবাহন চালাতে হলে অন্তত দুইটা টায়ার লাগে। এই সংসদেরও দুইটা টায়ার। একটা সরকারি দল, আরেকটা বিরোধী দল। যেকোনো একটা টায়ার যদি অকেজো হয়ে যায়, পুরো যানবাহন অকেজো। সুতরাং আমরা খেয়াল রাখব, এই টায়ার দুটি যাতে সচল থাকে। এই টায়ারে আপনি পিন লাগাবেন, পেরেক মারবেন, তাহলে কিন্তু ওই টায়ারটা ফুটো হয়ে যাবে। ফুটো হয়ে গেলে ওই টায়ারও চলবে না, যেটা অবশিষ্ট।’

জামায়াতের আমির বলেন, সরকারি দল বাজেটের প্রশংসা করতে থাকুক, বিরোধী দল হালকা ও ভারী প্রশংসার সঙ্গে ওয়াচডগের কাজটাও করে যাক। বিরোধী দলীয় নেতা এদিন প্রায় ৫০ মিনিট বক্তব্য দেন।

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল খুলে দেওয়ার আহ্বান সংসদে : বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ রাখায় প্রায় ৭৫০ জন মেডিক্যাল ও সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর অ্যকাডেমিক জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শুধু বই পড়ে কেউ ডাক্তার বা নার্স হতে পারে না, তাদের জন্য ব্যবহারিক শিক্ষা ও রোগী অপরিহার্য। হাসপাতালের কোনো দুর্বলতা থাকলে তা তদন্ত ও শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি মানবিক ও যৌক্তিক কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় অতি দ্রুত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সকালে সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

ডা. শফিকুর রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি মানবিক ও ‘মিশনারি’ মডেলে রূপান্তর করার ওপর জোর দেন।

দেশের চিকিৎসকদের প্রতিভার প্রশংসা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলোর পরিদর্শনে রেগুলারেটরি সংস্থাগুলো যতটা কঠোর ও তৎপর, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ততটাই নিষ্ক্রিয়। সরকারি খাতে বড় কোনো অপরাধ বা গাফিলতি হলেও সবাই বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধ যেখানেই হোক, সরকারকে দুই খাতকেই সমান চোখে দেখতে হবে।’

সম্প্রতি বন্ধ হওয়া আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকলে তার তদন্ত হোক এবং দোষীদের শাস্তি হোক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই হাসপাতালের সঙ্গে প্রায় ৭৫০ জন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী এবং সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত।’

এছাড়া বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা থেকে দেশ প্রচুর রেমিট্যান্স অর্জন করছে বলেও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মাঝপথে হাসপাতাল বন্ধের মতো সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাবে না।’ তাই ‘মানবিক ও যৌক্তিক কারণে’ অতি দ্রুত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত