ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে জনসমুদ্র

খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে জনসমুদ্র

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি শোক ও শেষশ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে অসংখ্য মানুষ সারিতে দাঁড়িয়েছেন। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শোক ও শেষশ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছেন ইরানিরা। গতকাল শনিবার সকাল ছয়টার দিকে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। গত শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল তেহরানে বিদেশি নেতাদের বেশির ভাগই খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গতকাল ও আজ রোববার তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের প্রয়াত কয়েকজন সদস্যের প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন।

ইরানের কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের শাসনক্ষমতায় থাকা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে তারা আশা করছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই বহু মানুষ ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। শনিবার সকাল নাগাদ সেটা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। ছয়টা থেকে জনসাধারণের জন্য অনুষ্ঠানস্থলের মূল ফটক খুলে দেওয়া হয়েছে। শ্রদ্ধা জানাতে এসে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানো সোমায়ি হামেদি নামের এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে চাই। তাই এভাবে অপেক্ষা করাটা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক কিংবা কঠিন কিছু নয়।’ বিপুল জনসমাগমের এ আয়োজন ঘিরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ইরান সরকার। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আকাশপথ বন্ধ রাখার কথাও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পূর্বসুরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে চলেছে। খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। নিরাপত্তার কারণে খামেনির ছেলে ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আগামী সোমবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকযাত্রা ইরানের দক্ষিণে কোম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। চলবে আগামী মঙ্গলবারও। আগামী বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ পৌঁছাবে। সেখান থেকে নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোকযাত্রা হবে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন। সবশেষে খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী শুক্রবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে খামেনির দাফন সম্পন্ন হবে। মাশহাদ তাঁর জন্মস্থান। নিরাপত্তার কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই দিনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরু হয়েছিল। আগ্রাসনের ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। গত ১৭ জুন দেশ দুটি একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। এখন তারা কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গতকাল তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ গতকাল ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তেহরানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রমুখ। আরও ছিলেন ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা।

খামেনির কফিনের পাশে ১৪ মাসের নাতনির ছোট কফিন : গত শুক্রবারই খামেনির লাশ তেহরানে এসে পৌঁছায়। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ছয় দিনব্যাপী এই শোকযাত্রা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন (দেড় থেকে দুই কোটি) মানুষ এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই আধ্যাত্মিক নেতা নিহত হন। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের রাস্তায় নেমে এসেছে লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ।

গতকাল শনিবার সকালে খামেনির লাশ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে আনা হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকায় মোড়ানো কফিনের ওপর রাখা ছিল তার চিরচেনা কালো পাগড়িটি। এই নেতার কফিনের পাশেই রাখা হয়েছিল একই হামলায় নিহত তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মরদেহ। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল খামেনির ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি’র ছোট কফিনটি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবারই খামেনির মরদেহ তেহরানে এসে পৌঁছায়। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ছয় দিনব্যাপী এই শোকযাত্রা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই হাজার হাজার সমর্থক গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে ভিড় করতে শুরু করেন। কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন (দেড় থেকে দুই কোটি) মানুষ এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।

শনিবার সকাল থেকে মোসাল্লা প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, শোকার্তদের হাতে ছিল প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল ব্যানার। তারা ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। নেতাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সাধারণ ইরানিরা। ২৭ বছর বয়সী এক শোকাতুর ব্যক্তি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘আমি আমার প্রিয় নেতা আলি খামেনিকে বিদায় জানাতে এসেছি। এমন দিন দেখতে হবে কখনও ভাবিনি। এই ট্র্যাজেডি দেখার আগে যদি আমার মৃত্যু হতো!’ বিলাপ করতে দেখা গেছে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও। পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখা যায়। শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নবনিযুক্ত প্রধান আহমদ ওয়াহিদি। উল্লেখ্য, খামেনির সঙ্গে একই হামলায় আইআরজিসির সাবেক প্রধান নিহত হওয়ার পর ওয়াহিদিকে এই পদে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে এই শেষকৃত্যে প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা।

খামেনির শেষ বিদায়ে শরিক হতে তেহরানে ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিদল : খামেনির বিদায়, জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরানে পৌঁছেছেন ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিদল। গত শুক্রবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ফেসবুকের এক পোস্টে তা জানিয়েছেন। পোস্টে বলা হয়, ইরান সরকারের আমন্ত্রণে ১১ দলীয় জোটের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ড. মো. কেরামত আলী এমপি, মো. নুরুল আমীন এমপি, পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা এমপি এবং ডা. এসএম খালিদুজ্জামান ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন। খামেনির বিদায়, জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিদলটি ৩ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ইরান সফর করবে। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত