ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইয়ামালের উল্লাস, মেসির কান্না

ইয়ামালের উল্লাস, মেসির কান্না

ফুটবল বিশ্ব কাল রাতে এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হলো, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একদিকে ডাগআউটে বসে থাকা এক মহাতারকার চোখে ঝরে পড়ল বেদনার অশ্রু, অন্যদিকে মাঠের সবুজ ঘাসে ডানা মেলে উড়ল ফুটবলের নতুন এক রাজপুত্রের বিজয়োল্লাস। লিওনেল মেসির কান্না আর লামিন ইয়ামালের বাঁধভাঙ্গা উল্লাসের এই বৈপরীত্যই যেন কাল রাতের ফুটবল ম্যাচটিকে রূপ দিয়েছিল এক চরম নাটকীয় মহাকাব্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গতকাল সোমবার ভোরের দিকে শেষ হওয়া ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় স্পেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা না পাওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে শিরোপা নিশ্চিত করে স্পেন। শেষ বাঁশি বাজতেই স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা উল্লাসে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে হতাশায় মাঠেই বসে পড়েন মেসিসহ আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকজন ফুটবলার। এমন আবেগঘন মুহূর্তে বিজয়োৎসবের মাঝেও প্রতিপক্ষের প্রতি সহমর্মিতা দেখান লামিন ইয়ামাল। তিনি মেসির কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে সাহস জোগান এবং কয়েক মুহূর্ত কথা বলেন। এই দৃশ্যটি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে দুই ফুটবলারের বহু বছর আগের একটি ঘটনার কারণে। ২০০৭ সালে বার্সেলোনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি সচেতনতামূলক উদ্যোগে মাত্র ছয় মাস বয়সী লামিন ইয়ামালকে কোলে নিয়ে একটি ছবি তুলেছিলেন তৎকালীন তরুণ তারকা লিওনেল মেসি। সম্প্রতি স্পেনের ফাইনালে ওঠার পর সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়। অনেকেই ছবিটিকে ফুটবল ইতিহাসের এক বিরল স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

ফাইনালের আগে ইয়ামালও মেসির বিপক্ষে খেলার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছিলেন। ছোটবেলায় যার কোলে উঠেছিলেন, সেই কিংবদন্তির বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলাই ছিল তার জন্য এক স্বপ্নের মুহূর্ত। ম্যাচ শেষে পরাজিত মেসিকে সান্ত¡না জানিয়ে যেন সেই গল্পে যোগ হলো আরেকটি মানবিক অধ্যায়। বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রজন্মের দুই তারকার এই মুহূর্তটি অনেকের কাছে ফাইনালের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে ওঠে। মাঠের লড়াই শেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌজন্য ও মানবিকতার এই ছবি ফুটবলের সৌন্দর্যকেই নতুন করে তুলে ধরে।

মেসির কান্না : অধিনায়ক লিওনেল মেসি রানার্সআপ মেডেল গলায় ঝুলালেন স্বাভাবিকভাবে। তারপর মঞ্চ থেকে নেমে আর্জেন্টাইন ভক্ত-সমর্থকদের দিকে যেতেই আবেগে ভাসলেন তিনি। হৃদয় ভাঙার দুঃখ বেরিয়ে এলো চোখের জল হয়ে। মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক নিউ জার্সির এই জমজমাট লড়াইয়ে স্পেনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তার দল ১২০ মিনিটে জালের ঠিকানা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। আমেরিকার এই টুর্নামেন্টটি ছিল প্রায় নিশ্চিতভাবেই মেসির শেষ। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর তার আবেগঘন প্রতিক্রিয়া একরকম সেটাই নিশ্চিত করেছিল। যখন ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজল, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নেন। সতীর্থ বা প্রতিপক্ষ কেউই তাকে সান্ত¡না দিতে পারছিলেন না। রানার্স-আপ মেডেল সংগ্রহের জন্য নিজেকে সামলে নেওয়ার পর সেই মুহূর্তের আবেগের চাপ ফুটবলের সর্বকালের সেরা এই খেলোয়াড়ের জন্য বড্ড বেশি হয়ে গিয়েছিল। ফলে স্পেন ট্রফি তোলার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মেসি হয়তো ইন্টার মায়ামির সঙ্গে খেলে যাবেন। তবে তার দেশের হয়ে আর কখনোই সর্বোচ্চ স্তরে খেলার সম্ভাবনা নেই। কারণ পরবর্তী বিশ্বকাপ যখন অনুষ্ঠিত হবে তখন তার বয়স হবে ৪৩ বছর।

তার এই কান্না শুধু চোটের কারণে মাঠ ছাড়ার হতাশা ছিল না; এ যেন ছিল কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতার প্রতিধ্বনি। ফুটবলকে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসেও সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার পরও ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাসে মেসির সেই অশ্রুসিক্ত চোখ ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়াবে।

ইয়ামালের উল্লাস : মেসির কান্নার ঠিক বিপরীত পিঠেই লেখা হচ্ছিল এক নতুন রূপকথা। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে যখন পুরো দল শিরোপা উদযাপনে ব্যস্ত, তখন মাঠের বাইরের একটি দৃশ্য কেড়ে নিয়েছে সমর্থকদের নজর। তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের সঙ্গে তার ছোট ভাই কিয়েনের আবেগঘন মুহূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মাত্র তিন বছর বয়সি কিয়েনের হাসি, উচ্ছ্বাস এবং সরল অভিব্যক্তি বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করেছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মাঠেই আনন্দ ভাগাভাগি করেন ১৯ বছর বয়সি তারকা ইয়ামাল। তার মা শেইলা এবানা, প্রেমিকা ইনেস গার্সিয়া এবং ছোট ভাই কিয়েনকে নিয়ে তোলা ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো ভাইরাল হয়ে যায়। শিরোপা জয়ের আনন্দের পাশাপাশি ইয়ামাল ও তার পরিবারের এই মুহূর্তগুলোও আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে।

পুরো বিশ্বকাপজুড়েই গ্যালারিতে কিয়েনের উপস্থিতি ছিল দর্শকদের বাড়তি আকর্ষণ। ভাইয়ের খেলা দেখতে গিয়ে কখনও উচ্ছ্বাস, কখনও বিস্ময়, আবার কখনও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা গেছে ছোট্ট কিয়েনকে। তার স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তির ভিডিও ও ছবি নিয়মিত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, যা ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর বড় পর্দায় ছোট ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন ইয়ামাল। কিয়েনকে দেখতে পেয়ে দূর থেকেই হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোর দৃশ্যগুলোও সমর্থকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দুই ভাইয়ের এই আন্তরিক সম্পর্ক ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে জায়গা করে নেয়। কিয়েনকে নিয়ে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেন ইয়ামালের মা শেইলা এবানা। তিনি নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন। সেই পোস্টগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কিয়েন বিশ্বকাপের সবচেয়ে পরিচিত শিশু মুখগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

অন্যদিকে, বিশ্বকাপজুড়ে ইয়ামালের পাশে ছিলেন তার প্রেমিকা ইনেস গার্সিয়াও। চলতি বছরের মে মাসে নিজেদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আনার পর এই প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একসঙ্গে আলোচনায় আসেন তারা। ফ্যাশন ও বিউটি ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচিত ইনেস স্টেডিয়ামে নিয়মিত উপস্থিত থেকে ইয়ামালকে সমর্থন দিয়েছেন। আড়ম্বরপূর্ণ সাজের পরিবর্তে তার সাধারণ ও স্বাভাবিক উপস্থিতিও সমর্থকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত