ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাম ও ডেঙ্গুতে ৮ জনের মৃত্যু

হামে মৃত্যুর ৫২ শতাংশ ৯ মাসের কম বয়সী
হাম ও ডেঙ্গুতে ৮ জনের মৃত্যু

দেশে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগে। এই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৯টি শিশু। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৯২২ শিশু। আর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৪৭ জনের। তবে এ সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। অপরদিকে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একদিনে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৩৭ জনের মৃত্যু হলো। সর্বশেষ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বরিশাল, খুলনা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায়। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে। এ সময়ে হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৭২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮৫৭ জন। শেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৪৬ জনসহ হাসপাতাল থেকে এখন পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন ৯ হাজার ৭৮৬ ডেঙ্গু রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬৯৮টি শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৫টি শিশুর; অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৭৯৩টি শিশু মারা গেছে। সর্বশেষ মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে সিলেট ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে একটি করে শিশু রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সময়ে ঢাকা বিভাগে ৯০ শিশু, চট্টগ্রামে ৩২, ময়মনসিংহে ১১, বরিশালে ৯, রংপুর ৩ এবং সিলেট ও খুলনায় ১ জন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া এই সময়ে ৮৮৯টি শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১ হাজার ১১টি শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭০, আর নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৭৮। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ১ হাজার ২৬ রোগী, যাদের মধ্যে ৯৭ হাজার ৫৩২ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতিমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।

এদিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম ও টিকা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান হওয়া দরকার। বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৭৭ জন রয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ৬৭, চট্টগ্রাম ৫৪, খুলনা বিভাগে ৪৩ জন, ময়মনসিংহে ২১, রাজশাহীতে ৪ জন ভর্তি হয়েছেন। মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জন করে, মে মাসে ১ জন, জুনে ১৩ জন ও জুলাইয়ে এ পর্যন্ত ১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এলাকাভিত্তিক মৃত্যুর এ সংখ্যা ময়মনসিংহ ও খুলনায় ৫ জন, ঢাকা বিভাগে ১৯, চট্টগ্রামে ৪, রাজশাহী ১ বরিশাল বিভাগে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২ হাজার ৬০৫ জন, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৮৭৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১ হাজার ৫৪৯ জন, খুলনায় ১ হাজার ৪২৫ জন, ঢাকা মহানগরের বাইরে ১ হাজার ৩৮১ জন, ঢাকা উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৫৮ জন, রাজশাহীতে ৩৫১ জন, ময়মনসিংহে ৪০৭ জন, সিলেটে ৮৩ জন ও রংপুরে ১২০ জন।

গবেষণার তথ্য -হামে মৃত্যুর ৫২ শতাংশ ৯ মাসের কম বয়সী : বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম ও টিকা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান হওয়া দরকার। গত এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এসব শিশুর বয়স ছিল ১৪ বছরের মধ্যে। গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও শিশু হাসপাতালের ১৯ জন গবেষকের একটি দল। গত রোববার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি অ্যান্ড জেনম সেন্টারের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও করণীয় নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ।

সেমিনারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান নিজস্ব অনুসন্ধান উপস্থাপন করেন। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন সেমিনারে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকাই পায়নি। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশের টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি, এদের বয়স ছিল ছয় মাসের কম। ৯ মাসের বেশি বয়স হলেও ৩৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকা পায়নি। বাকিদের ১৪ শতাংশ হামের টিকার এক ডোজ পেয়েছে। অবশিষ্ট ৬ শতাংশ হামের টিকার দুই ডোজ পেয়েছে। শিশুদের ৯ মাস বয়স থেকে কেন হামের টিকা দেওয়া হয় তার কারণ ব্যাখ্যা করেন মোস্তাফিজুর রহমান। রাজধানীর কমলাপুরে ২০০ মা ও ২০০ শিশুর ওপর করা পৃথক গবেষণা ফলাফল উদ্ধৃত করে এই বিজ্ঞানী বলেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পায়, তা ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে মিলিয়ে যায়। শিশুর বয়স যত কম হয়, টিকা তত কম কার্যকর হতে দেখা যায়। ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিশুর শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে এই হার বেড়ে যায়। ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু সুরক্ষা পায়।

সেমিনারে প্রথম উপস্থাপনায় আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামে মারা যাওয়া ৩৩৭ শিশুর মধ্যে ৯১ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি।

মারা যাওয়া ৩৩৭ জনের মধ্যে ২২ শতাংশের বয়স ৬ মাসের নিচে, ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে, ২৫ শতাংশের বয়স ৯ থেকে ১১ মাস। এক বছর থেকে চার বছরের মধ্যে ১৭ শতাংশ। বাকি ৬ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি পর্যায়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয়, নিউমোনিয়ায় মারা যায়। তিনি বলেন, টিকা ছাড়াও পুষ্টি, মায়ের বুকের দুধ শিশুকে সুরক্ষা দেয়। এই তিন বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম, টিকার কার্যকারিতা, শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গর্ভবতী মায়েদের হামের টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, লাইফ সায়েন্স অনুষদের সহকারী ডিন অপর্ণা ইসলাম ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান নাদিয়া সুলতানা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত