
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে তুলে ধরে দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের একমাত্র দোষ ছিল আমরা আধিপত্যবাদ মেনে নেইনি।’
তিনি দাবি করেন, ভারতে সম্প্রতি শেষ হওয়া ছাত্র আন্দোলনের পেছনেও জামায়াতকে দায়ী করা হচ্ছে, কারণ ‘সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণে আনলেও জামায়াতকে বশে আনা যায়নি’। ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে সোজা পথে চলুন। জাতি কঠিন সংকটে আছে,’ সরকারের উদ্দেশে বলেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) ভবনের কাউন্সিল হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ঢাকা মহানগর জামায়াতের উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের একমাত্র দোষ ছিল আমরা আধিপত্যবাদ মেনে নেইনি। এবারও দেখবেন ভারতের তরুণরা রাস্তায় নেমেছে, ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। সরকার বলে দিয়েছে, এই আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী উসকানি দিয়েছে। আমাদের নিয়ে তাদের এত ভয় কেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলকে একটি দেশ পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে, শুধু একটি দলকে পারেনি। সেই দলের নাম জামায়াতে ইসলামী। সমস্যাটা এখানেই।’
জুলাই আন্দোলনের সময় জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে দলটির আমির বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই তারা ছাত্রদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে আন্দোলন সফল হওয়ার পরও দলটি কখনও এর কৃতিত্ব দাবি করেনি। ‘আমরা বলিনি, আমাদের দলের এতজন শহিদ হয়েছেন কিংবা আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতে ছিল। বরং আমরা শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ও আহতদের সেবা করতে কাজ করেছি,’ যোগ করেন তিনি।
জুলাই শহিদ ও আহত ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, অনেকেই ছাত্রও ছিলেন না। তাদের কোনো কোটার দাবি ছিল না, সরকারি চাকরির প্রত্যাশাও ছিল না। তারা রাস্তায় নেমেছিলেন একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে।’
তিনি বলেন, ‘তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে যদি আমরা তাদের সঙ্গে বেইমানি করি, তাহলে আল্লাহ কি আমাদের ছেড়ে দেবেন? শহিদ পরিবারের কাছে, আহত জুলাইযোদ্ধাদের কাছে আমাদের জবাব দিতে হবে।’ বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, ব্যাংক-বিমা, কর্পোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি সবখানে ‘নির্লজ্জ দলীয়করণ’ চলছে। ‘যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষদের সরিয়ে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে, যেন একটি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য কায়েম করা যায়,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সহযোদ্ধারা কি শুধু এ জন্য জীবন দিলেন, যুদ্ধ করলেন, পঙ্গু হলেন যে একদলকে সরিয়ে আরেক দল ক্ষমতায় বসবে? তারা তো সিস্টেমের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই একই অন্ধকার গলিতে ঢুকে যাচ্ছি।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘ভুলভ্রান্তি মানুষের হয়, দলের হয়, সরকারেরও হয়। কিন্তু আমরা মনে করি, আপনারা জাতির সঙ্গে দেওয়া কথা লঙ্ঘন করেছেন, বিশ্বাস রক্ষা করেননি। আপনারা ফিরে আসুন, এই দাবি মেনে নিন। ধানাই-পানাই বাদ দিয়ে সোজা পথে চলুন। জাতি কঠিন সংকটে আছে। দেশের মানুষ আপনাদের পাশে থেকে দেশ গড়তে চায়।’
একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই শহিদদের হত্যার বিচার এবং আহতদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবি থেকে জামায়াত কখনও সরে আসবে না। বিচার আজ হোক বা ৫০ বছর পরে হোক, এই বাংলার মাটিতে তা একদিন হবেই।’
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলে যাব। জাতির অধিকারের প্রশ্নে আমাদের মুখ কেউ বন্ধ করতে পারবে না।’