
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও বিএনপিকে ঘিরে নানা গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও বিকৃত কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার, গণমাধ্যমের ফটোকার্ড বিকৃত করে প্রচারণা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে মিথ্যা দাবি ছড়ানোর মতো একাধিক ঘটনা শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম 'বাংলাফ্যাক্ট'।
বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে সম্প্রতি বিএনপি ও সরকারকে লক্ষ্য করে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি দাবিকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো ভিডিও, বিকৃত ফটোকার্ড ও ভিন্ন ঘটনার ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি চ্যানেল ২৪-এর একটি ফটোকার্ড বিকৃত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোর ঘটনা শনাক্ত করে বাংলাফ্যাক্ট।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মূল ফটোকার্ডের তথ্য পরিবর্তন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করা হয়েছে। ফলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডের বক্তব্যের মিল নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যালয়ে দুপুরের খাবারের দৃশ্য দাবি করে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও যাচাই করেছে বাংলাফ্যাক্ট। বাংলাফ্যাক্টের তথ্যমতে, ভিডিওটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। ভিডিওটির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল গত ২১ জানুয়ারি তারেক রহমানের সিলেট সফরের সময়। নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি তিনি তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানের পৈতৃক বাড়ি তথা শ্বশুরবাড়িতে গেলে সেখানে তাঁকে নানা পদের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সেই সময়ের দৃশ্য। অর্থাৎ পুরোনো একটি বাস্তব ঘটনার ভিডিওকে ভিন্ন স্থান ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। বিএনপিকে দোষারোপ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওকেও পুরোনো বলে শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট। ভিডিওতে দেখা যায়, দেশীয় অস্ত্রধারী দুই ব্যক্তির হামলা থেকে বাঁচতে একজন ব্যক্তি এক নারীর আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ভিডিওটি বিএনপি সরকারের আমলের বলে দাবি করে প্রচার করা হলেও বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের সময়ের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, ভিডিওটি ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর উত্তরায় প্রকাশ্যে দুই ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনার। অর্থাৎ অন্তরর্বতী সরকারের সময়ের পুরোনো ভিডিওকে বর্তমান সরকারের সময়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক নেতা বা ভিডিও নয়, দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঘটনা শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট।
প্রতিষ্ঠানটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, বেনামি ঋণ, বড় অঙ্কের জালিয়াতি এবং প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে।
বাংলাফ্যাক্টের দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন নীতিগত ছাড়, ঋণ পুনঃতফসিল ও অন্যান্য হিসাবগত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই ও নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব অনিয়মের অনেক তথ্য সামনে আসে।
বাংলাফ্যাক্ট বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশকে ঘিরে দেশ ও বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও পেজে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। এসব অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কখনো অন্তরর্বতী সরকার, কখনো ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া দল ও সংগঠন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও বিএনপি সরকারকে দেখা যাচ্ছে।
পুরনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড বিকৃত করা, বাস্তব কোনো ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যকে সত্য হিসেবে প্রচার-এসব কৌশলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারকে সমর্থন কিংবা বিরোধিতার আবেগ থেকে অনেক ব্যবহারকারী যাচাই ছাড়াই পোস্ট, ভিডিও ও ছবি শেয়ার করেন। এতে সত্য ঘটনা, পুরোনো ঘটনা এবং সম্পূর্ণ বানানো তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাফ্যাক্ট নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবি যাচাই করে সত্যতা তুলে ধরছে। প্রতিষ্ঠানটি পিআইবির ফ্যাক্টচেক, মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস টিম হিসেবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্তের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সংবাদ নিয়ে গবেষণা করে।
রাজনৈতিক দল ও সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে সেই সমালোচনা যেন মিথ্যা তথ্য, বিকৃত ছবি কিংবা পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে না হয়- এ বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দাবি প্রচার না করাই বিভ্রান্তি ঠেকানোর অন্যতম প্রধান উপায়।