
দেশে একসঙ্গে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতেও একদিনে প্রাণ গেছে আরও ছয়জনের। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০০ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯০৯ জনের। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ১ হাজার ১৬৫ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১১২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সাতজন। ফলে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের বুলেটিনে জানানো হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে মারা গেছেন ৪০৭ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৯৩, চট্টগ্রামে ৬৬, বরিশালে ৫৭, ময়মনসিংহে ৭৭, খুলনায় ৩৮ এবং রংপুর বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন। অন্যদিকে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩৩ জনের। গত একদিনে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই রয়েছেন ৩৬৪ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৬২, সিলেটে ১৫৩, বরিশালে ১১৬, খুলনায় ৯০, ময়মনসিংহে ৮২, রাজশাহীতে ৩১ এবং রংপুরে ১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বাড়ছে ডেঙ্গুর দাপটও : হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও থামছে না। বরং প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৯২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৯ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে খুলনা বিভাগের দুজন রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ৮১ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৫১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। দুই সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন আরও ৩২৭ জন।
এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৭৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২, খুলনা বিভাগে ২৮৪, ময়মনসিংহে ৮০, রংপুরে ৫৪ এবং সিলেট বিভাগে ১৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৮ হাজার ৪৩০ জন। তাদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী হাসপাতালে আসায় চিকিৎসাব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে।
২০২৩-এর রেকর্ডের শঙ্কা : বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। সেই হিসাবে ২০২৩ সালেই দেশে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। একই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বোচ্চ ছিল—১ হাজার ৭০৫ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত যে হারে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে এবং মৃত্যু হচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায় এটি শুধু নগরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে থাকছে না।
একসঙ্গে দুই রোগের চাপ : বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও ডেঙ্গু— দুটি রোগের প্রকৃতি ও সংক্রমণের ধরন ভিন্ন হলেও একই সময়ে এ দুটির প্রকোপ বাড়লে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার নির্ভর করে এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারের ওপর। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপও বাড়ছে। জ্বর, শরীরে র্যাশসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে আসছেন। তাদের একটি অংশকে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ফলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ডেঙ্গুর রোগীদের মধ্যে জটিলতা তৈরি হলে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি ওয়ার্ড এবং অন্যান্য চিকিৎসাসেবার ওপরও চাপ বাড়ছে।
সতর্কতা ও প্রতিরোধে জোর : একদিকে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ও আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের পরিসংখ্যান বলছে, দুই রোগের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি এখন আর অবহেলা করার মতো নয়। একদিকে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, অন্যদিকে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুও ১৩৯ জনে পৌঁছেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা দিয়ে এই দুই রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধ, আগাম শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা একসঙ্গে জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে হামের ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচি এবং ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। দেশে একসঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুর এমন বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রতিদিনের মৃত্যুর সংখ্যা ও হাসপাতালমুখী রোগীর চাপ পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে। এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুই রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই তৈরি হচ্ছে।
হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন ২৫ সেপ্টেম্বর শুরু : টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ না কমায় দেশে আবারও বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর এ ক্যাম্পেইন শুরু হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে এসে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট টিকাও আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে পৌঁছাবে। হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মধ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় চার সিটি কর্পোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যা শেষ হয় ২০ মে। তারপরও সংক্রমণ কমছে না। সরকারি হিসাবে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে বুধবার পর্যন্ত ১০০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'হামের টিকা ক্যাম্পেইন শেষ করার পরও যখন সংক্রমণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন সরকার অবশিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে।'
এ কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার দেশে কোনো টিকা রেখে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার কথা বলেছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, 'প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'