
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে সংকট কাটছেই না। দাম সমন্বয় করে বাড়ানোর পরও নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার মিলছে না। অক্টোবরের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। কোথাও এত বেশি দাম দিয়েও মিলছে না চাহিদামতো গ্যাস। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, কাটছে না সংকটও। বাজারে এই অস্থিরতার পেছনে সরবরাহ ঘাটতি, কোম্পানিগুলোর মূল্যতালিকায় অসংগতি, পরিবেশকদের বাড়তি ব্যয়ের দাবি এবং সম্ভাব্য মজুতদারির অভিযোগ সামনে এসেছে। আমদানিকারকরা বলছেন, দেশে এলপিজি আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশকদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করছে না অধিকাংশ কোম্পানি। ফলে আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের বড় ব্যবধান : গত পহেলা অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছেন এক ক্রেতা। তখন বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৯১৫ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। অক্টোবরে দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণের পরও বাজারে সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। খিলগাঁও এর বিক্রেতা রাসেল হোসেনের বলেন, তার কাছে প্রতি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা চাওয়া হলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। অথচ বিইআরসির কাঠামো অনুযায়ী, পরিবেশক পর্যায়ে তার কেনার কথা ১ হাজার ৭৯২ টাকায়। একই এলাকার নয়নের সরবরাহকারী ডিলারের গুদামেও মিলেছে অনিশ্চয়তার চিত্র। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গুদামটি বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট ডিলারের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে তার অপারেটর কোম্পানি কোনো এলপিজি সরবরাহ করেনি। পরবর্তী সময়ে প্রতি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১ হাজার ৯৯০ টাকা হতে পারে বলেও তিনি ধারণা দেন।
আমদানি স্বাভাবিক, তবু সরবরাহে ঘাটতি কেন : এলপিজির বাজারে সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও বাজারে সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ কমছে না।
দেশে এলপিজির প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি ও সরবরাহ করে। লাইসেন্সধারী কোম্পানি প্রায় ৩০টির বেশি হলেও নিয়মিত আমদানি করছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ে। কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত পণ্য দিলেও তাদের কাছেও চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশকদের অভিযোগ, কোনো কোনো কোম্পানি পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না করেও সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করে মূল্যতালিকা দিয়েছে। এতে সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি পাইকারি পর্যায়েই বাড়তি দামের চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার অপারেটরদের দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য রয়েছে; সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করতে পারে।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় কোম্পানির সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আমদানি, মজুত, প্ল্যান্ট থেকে পণ্য ছাড় এবং বাজারে বিক্রির তথ্য মিলিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও কমিশন নিয়ে বিরোধ : এলপিজির দাম নির্ধারণের পাশাপাশি পরিবেশকদের কমিশন নিয়েও দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে আসছে। সে সময় পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাঁচ বছর আগের এই কমিশন দিয়ে বর্তমান পরিবহন, শ্রমিক, গুদাম, বিদ্যুৎ ও লাইসেন্স ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার পরিবহনে প্রায় ৫০ টাকা খরচ হয়। ট্রাকে ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে লাগে আরও ৩৫ টাকা। কর্মচারী, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ে প্রয়োজন হয় প্রায় ২৫ টাকা। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করলে পরিবেশক পর্যায়ে মোট ১৫০ টাকা দরকার বলে দাবি তাদের।
নির্ধারিত কমিশন ৫০ টাকা হওয়ায় প্রতি সিলিন্ডারে ১০০ টাকার ঘাটতি রয়েছে বলে সংগঠনটির বক্তব্য।
এ বিষয়ে সমিতি বিইআরসিকে চিঠি দিয়ে কমিশন ও অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে কমিশনের বক্তব্য, গণশুনানি ও প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্ত ছাড়া ইচ্ছামতো ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের দাবি যাচাই করা প্রয়োজন হলেও সেই অজুহাতে নির্ধারিত খুচরা মূল্য অমান্য করার সুযোগ তৈরি হলে ভোক্তার সুরক্ষা আরও দুর্বল হবে।
এলপিজির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ব্যয়চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের প্রকাশিত দামের তুলনায় বাংলাদেশে গৃহস্থালি এলপিজির কেজিপ্রতি ব্যয় বেশি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে দেখা যায়। তুলনামূলক হিসাবে ভারতে ভর্তুকি ছাড়া প্রতি কেজির দাম প্রায় ১০৮ টাকা, পাকিস্তানে ১২৪ টাকা, নেপালে ১১৫ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১১৬ থেকে ১৩০ টাকা। বিপরীতে বাংলাদেশে অক্টোবরের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজির দাম প্রায় ১৫৩ টাকা। তবে দেশভেদে কর, ভর্তুকি, সিলিন্ডারের আকার ও মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এসব দামের তুলনা একই ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা জরুরি। তারপরও বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি ভোক্তার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। তাদের বড় অংশ রান্নার কাজে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আবাসিক খাতে নতুন পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে এলপিজির গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে বাজারের অস্থিরতা এখন শুধু ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, সাধারণ পরিবারের নিত্যদিনের ব্যয়ের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২৪২টি অভিযানে ৪৭৮টি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাসহ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিইআরসিও সংকটের কারণ অনুসন্ধানে তদারকি শুরু করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আমদানিকারক, অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা, পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কোন কোম্পানি কত এলপিজি আমদানি করছে, কতটা মজুত রয়েছে, প্ল্যান্ট থেকে কতটা বাজারে ছাড়া হচ্ছে এবং কোন দামে বিক্রি হচ্ছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এলপিজির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে সরকারি আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। সরবরাহকারী নির্বাচন ও জাহাজভাড়ার ব্যয়সহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে সরকারি উদ্যোগ এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি ও মজুত বাড়ানো গেলে বেসরকারি সরবরাহের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এলপিজির বাজারে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আমদানি ও সরবরাহের স্বচ্ছ হিসাব, যৌক্তিক মূল্যকাঠামো এবং কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ীদের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধ করাও সরকারের দায়িত্ব। নির্ধারিত মূল্য কাগজে থাকলেই হবে না, সেই দামে ভোক্তার হাতে গ্যাস পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অন্যথায় আমদানি স্বাভাবিক থাকার দাবি আর বাজারের বাস্তবতার মধ্যে এই ব্যবধান থেকেই যাবে।
এদিকে কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে— এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর নজরদারি করতে পরামর্শ দিচ্ছেন। বিইআরসি ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন, জ্বালানি বিশেজ্ঞ এম শামসুল আলম বলেন, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। আদালতের আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায় বিইআরসি। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা। এরপরও সেটা কার্যকর করতে পারে না। এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং করা দরকার। কতিপয় মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীরা বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এদেরসহ বাজার সিন্ডিকেট দের এখনই ধরা না গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না।