
প্রচলিত বাজারের বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ অঞ্চলের ১১টি দেশে ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ব্রাজিল ও চিলি থেকেই এসেছে প্রায় ৬৩ শতাংশ রপ্তানি আয়। তবে এ অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও তৈরি পোশাকনির্ভর। নতুন বাজারের পাশাপাশি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পাটজাত পণ্য, চামড়াজাতসামগ্রী, জুতা, হস্তশিল্প ও গৃহসজ্জার উপকরণ রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ব্রাজিলে ৭ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। চিলিতে রপ্তানি হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। এ দুই দেশে সম্মিলিত রপ্তানি আয় ১২ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অন্যদিকে, পেরুতে ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার, কলম্বিয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার, উরুগুয়েতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার এবং আর্জেন্টিনায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
রপ্তানি আয়ের এ চিত্র দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরলেও পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন ক্রেতা তৈরি করা গেলে রপ্তানি আয়ের ভিত্তি বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে কয়েকটি বাজার ও একটি প্রধান শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে। ইপিবির পণ্যভিত্তিক হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে ওভেন পোশাক ও পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। একই সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। দুই শ্রেণির পণ্য মিলিয়ে আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা ওই দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। জুতা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে প্রায় ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী ও ভ্রমণসামগ্রীও রপ্তানি তালিকায় রয়েছে। এসব খাতে রপ্তানি বাড়াতে পারলে দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পোশাকের বাইরে বাজার ধরার চেষ্টা
দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে সম্প্রতি ব্রাজিলে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে ইপিবি ও বাংলাদেশ দূতাবাস। গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত 'হোম শো ব্রাজিল ২০২৬' প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ইপিবির আর্থিক সহায়তায় এবং ব্রাসিলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মাদার ট্যানারি, রেইনবো জুট ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস। প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচটি বুথে নিজেদের পণ্য তুলে ধরে। প্রদর্শনীতে পাটজাত পণ্য, ব্যাগ, চামড়াজাত সামগ্রী, প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি ঝুড়ি, গৃহসজ্জার উপকরণ, বাঁশের পণ্য, টেরাকোটা, মাটির তৈরি সামগ্রী ও নকশিকাঁথা স্থান পায়। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য সম্পর্কে বিদেশি ক্রেতাদের জানাতে ইপিবি ও দূতাবাসের পক্ষ থেকেও একটি প্রচারমূলক বুথ স্থাপন করা হয়।
প্রদর্শনী চলাকালে সম্ভাব্য ক্রেতারা বাংলাদেশের স্টল পরিদর্শন করে পণ্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের গৃহসজ্জা ও জীবনযাপন- সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে ব্রাজিলের ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়াই বাজার সম্প্রসারণের শেষ ধাপ নয়। সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখা, পণ্যের নমুনা ও মূল্য নিয়ে আলোচনা এবং পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক চুক্তির দিকে এগোনো জরুরি। বাজারে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে হলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের নকশা, মান ও দাম নির্ধারণের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাজার গবেষণা ও পণ্যের বৈচিত্র্যে গুরুত্ব
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসসকে বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং উদীয়মান আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইপিবি কাজ করছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় আরও পরিকল্পিত ও পেশাদারভাবে অংশ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অল্প কয়েকটি রপ্তানি বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়কে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ কারণে নতুন পণ্য ও নতুন বাজার খুঁজে বের করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বাজারের চাহিদা, ভোক্তার পছন্দ, পণ্যের দাম, প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক রীতিনীতি সম্পর্কে আগাম গবেষণা করা প্রয়োজন। এতে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুফল বাড়বে। একই সঙ্গে জাতীয় প্যাভিলিয়নের ব্র্যান্ডিং জোরদার, রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতি উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর মাধ্যমে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় বাজার সম্পর্কে সীমিত ধারণা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের ঘাটতি রপ্তানিকারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাজারভিত্তিক গবেষণা ও ক্রেতা অনুসন্ধানের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
ব্রাজিল-চিলির বাইরে নজর
দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ ব্রাজিল ও চিলিনির্ভর হওয়ায় এ দুই বাজারে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি অন্য দেশগুলোতেও ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। পেরু, কলম্বিয়া, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মতো বাজারে নতুন ক্রেতা তৈরি করা গেলে রপ্তানি গন্তব্যের পরিধি বাড়বে। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোরও সুযোগ তৈরি হবে। তবে সব দেশের বাজার এক রকম নয়। ভোক্তার পছন্দ, আমদানির চাহিদা, পণ্যের মূল্য এবং প্রতিযোগিতার ধরন দেশভেদে আলাদা। তাই একই কৌশলে সব দেশে পণ্য রপ্তানির চেষ্টা না করে বাজার অনুযায়ী পণ্য নির্বাচন ও বিপণন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাট, চামড়া, জুতা ও হস্তশিল্পের মতো পণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ক্রেতাদের চাহিদা যাচাই এবং পণ্যের মান ও নকশার উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বাজার গবেষণা, ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম তিন মাসে প্রায় ১৯ কোটি ৫২ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় এ অঞ্চলে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থান তুলে ধরেছে। এখন এ অবস্থানকে আরও বিস্তৃত ও টেকসই করাই বড় চ্যালেঞ্জ।