ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এইচইইউ'র গবেষণা

চিকিৎসাব্যয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ

চিকিৎসাব্যয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ

নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে দেশে ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ ২০২২ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৫ সালে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যান ৫৬ লাখ মানুষ, যা ছিল তখনকার জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে অর্ধেকের বেশি। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। কিন্তু, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের অনুপাত বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। ২০০৫ সালে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে। সারাবিশ্বের হিসাবে ২০২২ সালে এ হার ছিল ২৬ শতাংশ।

এইচইইউর ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে দরিদ্র পরিবারগুলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডিশ দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত 'বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন' শীর্ষক এ গবেষণার ফল গত বুধবার উপস্থাপন করা হয়।

নিজস্ব ব্যয় বলতে চিকিৎসার জন্য একটি পরিবারকে সরাসরি যে অর্থব্যয় করতে হয়, তা বোঝানো হয়েছে। এর মধ্যে ওষুধ কেনা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা এবং চিকিৎসার খরচ রয়েছে। সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ এসব খরচ বহন না করলে পরিবারকেই তা মেটাতে হয়।

অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর হাতে থাকা অর্থের ৪০ শতাংশের বেশি চিকিৎসায় ব্যয় করতে হলে একজন ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে বিবেচনা করা হয়। আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে কোনো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেলে তাকে চিকিৎসাব্যয়ের কারণে দরিদ্র হয়েছেন বলে ধরা হয়।

চিকিৎসার ব্যয়ের প্রবণতা, দারিদ্র্যের ওপর এর প্রভাব এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য মূল্যায়ন করতে গবেষকেরা ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালে পরিচালিত খানা আয় ও ব্যয় জরিপের (এইচআইইএস) তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিকিৎসাব্যয়ের কারণে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের হার ২০০৫ সালের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সুব্রত পাল বলেন, 'এতে দেখা যায়, আর্থিক চাপে না পড়ে চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।' পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসার পেছনে খরচ হলে তাকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় বলা হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর এ সূচকের পরিবর্তে আর্থিক সংকটের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। কারণ বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের সূচক দিয়ে মানুষের প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। সুব্রত পাল জানান, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করার পর পরিবারের চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয় অনেক বেড়েছে। ২০০৫ সালে একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসাব্যয় ছিল ১ হাজার ২৪১ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৩৮ টাকায়। একই সময়ে চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয় হয়েছে, এমন পরিবারের অনুপাত ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাব্যয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শের ফি। বহির্বিভাগের চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির ওপর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ফার্মেসির মাধ্যমে নেওয়া হতো। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশে।

সুব্রত পাল আরও জানান, ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রাম ও শহর, দুই এলাকাতেই চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকট বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন গ্রামের মানুষ। ২০২২ সালে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ এ সংকটে পড়েন। শহরাঞ্চলে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক চিত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। সুব্রত পাল বলেন, ২০০৫ সালে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের হার সবচেয়ে কম ছিল বরিশাল বিভাগে, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালে বিভাগটিতেই এ হার বেড়ে সর্বোচ্চ ৫৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রধান ভরসা। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ কমেছে। ২০১৬ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতেন। ২০২২ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় ৫৬ শতাংশে। অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার হার ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে গবেষণাটি। এতে বলা হয়েছে, দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বেশি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের সুবিধা তাদের অনুকূলে যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, '২০১৬ সালের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্রদের অনুকূলে থাকা সুবিধা বণ্টনের প্রবণতা কমেছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, যাদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সরকারি সম্পদ যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না।' চিকিৎসাব্যয়ের কারণে মানুষের আর্থিক সংকট কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করার সুপারিশ করে হয়েছে গবেষণায়।

এছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার সুযোগ বিনামূল্যে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছিল, গবেষণার ফল তা তুলে ধরেছে।

চিকিৎসার নিজস্ব ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল উপস্থাপনায় আরও ছিলেন ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের তোহিদুল ইসলাম ও সায়েম আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়াল। সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক এনামুল হক।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত