ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাইপোগ্লাইসেমিয়া

ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
হাইপোগ্লাইসেমিয়া

আমাদের দেহ চলে গ্লুকোজ হতে পাওয়া শক্তির উপর নির্ভর করে। গ্লুকোজ ভেঙে এটিপি তৈরি হয় আর তা শক্তি দেয় আমাদের। কিন্তু যখন খাবার গ্রহণ পর্যাপ্ত না হয়, কিংবা ডায়বেটিস রোগের কারণে ঔষধ ব্যবহার কিংবা অতিরিক্ত সচেতনতাজনিত কারণে রক্তের গ্লুকোজ কমে যায়, শরীর তখন নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং শক্তিহীন হয়ে যায়। এভাবেই হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া কী : আমাদের যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় কাজে দরকার হয় শক্তি। এ শক্তি আমরা পাই এটিপি বা অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট থেকে। এটিপি আসে আমাদের রক্তে বহমান গ্লুকোজের দহন থেকে। কাজেই রক্তে গ্লুকোজের অবিরাম সরবরাহ আমাদের বেঁচে থাকা ও জীবন ধারণের জন্যে অতীব জরুরি। রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অধিক গ্লুকোজ থাকলে যেমন ডায়বেটিস বা বহুমূত্র রোগ হয় তেমনি রক্তে গ্লুকোজের মান স্বাভাবিক অপেক্ষা কমে গেলেও শরীর ব্যাপক জটিলতার সম্মুখীন হয়। এ অবস্থাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে।

সাধারণত রক্তে অভূক্ত অবস্থায় প্রতি ডেসি লিটার রক্তে ৬৫-৭০ মিলি গ্রাম গ্লুকোজ থাকে যা খাওয়ার দু'ঘন্টায় বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ডেসি লিটার রক্তে ১৮০-২০০ মিলিগ্রাম হতে পারে। এর যে কোন সময় পরে রক্তে গ্লুকোজের মান ১১০-১৪০ মিলি গ্রাম/ডেসি লিটার হলো নর্মাল বা স্বাভাবিক। যে কোনো কারণে রক্তে গ্লুকোজের মান এর চেয়ে কমে গেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে।

ডায়বেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে যারা ইনসুলিন কিংবা রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণের ঔষধ সেবন করেন তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ বা উপসর্গ : মুখের কথা জড়িয়ে যায়, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, হাঁটার সময় দুপায়ে নিয়ন্ত্রণ থাকে না, গায়ে ঘাম হতে থাকে যার কোনো দৃশ্যমান কারণ থাকে না, ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে হয়, মুখে ফেনা হতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যায়, পা দুটো অবশ ও শক্তিহীন হয়ে আসে, ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হয়ে আসবে শরীর, মাথা চক্কর দিয়ে উঠতে পারে, মাথা হাল্কা হাল্কা অনুভূত হতে পারে, যে কোন বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা কনফিউশন তৈরি হতে পারে, বিরক্তির মনোভাব তৈরি হয়, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত হয়, হাতে-পায়ে কাঁপা কাঁপা অনুভূতি হয়, মাথাব্যথা হতে পারে, খিঁচুনি হতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তির চেতনা লোপ হতে পারে, ঘুমের ভিতরে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে ঘুমেই চিৎকার দিয়ে উঠতে পারে, ঘুমে দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তি কোমায় যেতে পারে এবং দ্রুত গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করা না গেলে মৃত্যুবরণ করতে পারে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণ : ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগী যারা ইনসুলিন গ্রহণ করেন তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার শিকার হতে পারেন, যারা সালফোনাইল ইউরিয়া মেগ্লিটিনাইড জাতীয় ঔষধ সেবন করেন তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে উপবাস করেন বা অনশন করেন তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, যারা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করেন কিন্তু পর্যাপ্ত শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করেন না তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, ম্যালেরিয়া বা এ জাতীয় অসুস্থতায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে আসে, অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াসের টিউমার হলে, বিপাকের জন্মগত বিভ্রাট হলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে, সেপসিস হলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার জটিলতা : একাধিক অঙ্গের অসামর্থ্য, হৃদপিন্ডের তাল হারানো, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতিসাধন, কোমা, মৃত্যু।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার চিকিৎসা : হাল্কা বা মাঝারি হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ, তীব্র বা মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়াতে রক্তে ২৫% গ্লুকোজ স্যালাইন শিরায় প্রদান, রক্তে গ্লুকোজের মান নিয়ন্ত্রণকারী সকল ঔষধ প্রয়োগ বন্ধ রাখা, দিনে কয়েকবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিরূপণ করা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত