ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

টানা তৃতীয় বছরের মতো ‘ঈদ নেই’ গাজায়

টানা তৃতীয় বছরের মতো ‘ঈদ নেই’ গাজায়

ইসরাইলের ক্রমাগত হামলা, কঠোর অবরোধ এবং উপর্যুপরি বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজা উপত্যকার গবাদিপশু খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানির ঈদ উদযাপনে ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন গাজার অধিকাংশ পরিবার। দীর্ঘদিনের এই ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য এখন গাজাবাসীর জীবন থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা সিটির অন্যতম শীর্ষ গবাদিপশু খামারি ছিলেন মাজেন আল-জেরজাউই। বছরের এই সময়ে তিনি কোরবানি উপলক্ষে শত শত ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করার প্রস্তুতি নিতেন। তবে বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জেরজাউই এখন একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান, যেখানে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কোনোমতে উপত্যকায় প্রবেশ করা হিমায়িত (ফ্রোজেন) মাংসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, বছরের এই সময়ে তিনি প্রায় ২০০টি গরু ও ভেড়া বিক্রি করতেন, অথচ আজ তার কাছে একটি পশুও নেই। ইসরাইল গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা গাজার মানুষকে এমনভাবে দেখছে যেন তারা এখানে সাময়িক সময়ের জন্য বসবাস করছে, আর জীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই সরবরাহ করা হচ্ছে।

সাধারণত ঈদুল আজহার সময় গাজায় কোরবানির পশুর ব্যাপক চাহিদা থাকে। যুদ্ধের আগে এই চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে এবারও সেই চেনা দৃশ্য ফিরছে না। গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা এবং পশুখাদ্য ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি গবাদিপশু খাত ধ্বংস হয়ে গেছে। পশু সংকটের কারণে বাজারে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যুদ্ধের আগে গাজায় একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। বর্তমানে সেই একই ভেড়া কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে প্রায় ৭,০০০ ডলার (প্রায় ২০,০০০ শেকেল)। চড়া দামের কারণে জেরজাউই প্রবাসীদের অনুরোধ করেন কোরবানি না দিয়ে সেই টাকা দিয়ে হিমায়িত মাংস কিনতে কিংবা আত্মীয়দের অন্য কোনো মৌলিক প্রয়োজনে সাহায্য করতে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান জানায়, যুদ্ধের শুরুতেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে। পশুপাখির পাশাপাশি খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম এবং ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। খামারিরা জানান, বোমাবর্ষণের কারণে যেমন অসংখ্য পশু মারা গেছে, তেমনি বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে বেঁচে থাকা পশুদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় সস্তায় বা স্রেফ ময়দা কেনার জন্য পানির দামে পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন খামারিরা।

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে গাজায় যেখানে ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, তা এখন কমে মাত্র ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। আর গরু বা বাছুর গাজা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে যে সামান্য কিছু ছাগল-ভেড়া বেঁচে আছে, তা যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো বিক্রির জন্য নয়। পানি তোলার পাম্প বা কূপগুলো সচল না থাকায় এই খাতটি পুনরুজ্জীবিত করারও কোনো সুযোগ নেই।

কোরবানির এই অনুপস্থিতি গাজার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা জানান, দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা কোনো ঈদ উদযাপন করতে পারছেন না। কোরবানির আনন্দ এবং তা সবার মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার যে অনুভূতি, সেটি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, গাজার অধিকাংশ পরিবারের এখন তিন বেলার খাবার জোগাড় করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রোজেন মাংসের স্বাদ পাননি।

জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর ইসরাইলের কঠোর ও অনিয়মিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি উৎসব বন্ধ করেনি, বরং এর সাথে জড়িত পশুচিকিৎসক, খামারি, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইসরাইল সচেতনভাবেই গাজার সমাজকে পরনির্ভরশীল করে রাখতে এবং তাদের স্বনির্ভর হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করতেই এই অবরোধ টিকিয়ে রেখেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত