ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

'দোয়া করবেন' বলে সংসদে আবেগাপ্লুত মির্জা আব্বাস

'দোয়া করবেন' বলে সংসদে আবেগাপ্লুত মির্জা আব্বাস

দীর্ঘ অসুস্থতার পর সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। তিনি বক্তব্যের শেষ অংশে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, 'আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যে কয়দিন বেঁচে থাকি, যেন দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যেতে পারি।'

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন মির্জা আব্বাস। অধিবেশন কক্ষে হুইলচেয়ারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমানউল্লাহ আমানের পাশে বসে বক্তব্য রাখেন তিনি।

এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা আব্বাস। এরপর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস দেশে এবং সিঙ্গাপুর ও মালেশিয়ায় চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি দেশে ফেরেন তিনি। সংসদে লিখিত বক্তব্যে মির্জা আব্বাস বলেন, আপনাকে ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার। আপনার মাধ্যমে সংসদের আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ভাইদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা হয়তো জানেন, আমি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসাধীন আছি। আমার নির্বাচনের পর কোনও এক মিটিংয়ে আমি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হই এবং তারপর থেকে বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ছিলাম ভোগান্তিতে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ নই। আপনাদের আবেগ, ভালোবাসার কারণে আমাকে আসতে হয়েছে। আমার চিকিৎসা শেষ হয়নি। মাননীয় সংসদ সদসবৃন্দ ও স্পিকার আমি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা রাষ্ট্রপতি জিয়ার রহমানকে এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।'

তিনি বলেন, 'মাননীয় স্পিকার আজকের দিনটি আমার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন এবং স্মরণীয়। ২০০৬ সালের পর আজ আমরা মহান জাতীয় সংসদের এই পবিত্র কক্ষে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের ও গর্বের আর কী হতে পারে।' মির্জা আব্বাস বলেন, 'দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বর্তমান সংসদ যাত্রা শুরু করার পর পরই বিগত ১১ মার্চ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। দীর্ঘ সময় চিকিৎসার জন্য আমাকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় থাকতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে ইচ্ছা সত্ত্বেও সংসদ অধিবেশনে নিয়মিত হতে পারেনি। আজ চিকিৎসা শেষ বললে ভুল হবে, আমার চিকিৎসা শেষ হয়নি। চিকিৎসার মাঝ পথে প্রথমবারের মতো আমি সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পেরে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে যারা আমার জন্য দোয়া করেছেন, খোঁজ-খবর নিয়েছেন, পাশে থেকেছেন- তাদের প্রত্যেকের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।'

তিনি বলেন, 'স্পিকার আমার অসুস্থতার সময় মহান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সারাক্ষণ আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এ জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও আপনাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। স্পিকার, আপনি নিজেও আমাকে দেখে এসেছেন। যদিও আমি আপনাকে দেখতে পারিনি। আমি পরে জেনেছি। একজন সংসদ সদস্যের প্রতি স্পিকারের এ মানবিক ও আন্তরিক আচরণ আমাকে স্পর্শ করেছে। এটি শুধু একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নয়, এটি আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের মানবিক, সুন্দর ও উজ্জ্বল উদাহরণ। আপনাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আমি কোনোদিন ভুলব না।'

তিনি বলেন, 'মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আপনার দায়িত্বের পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবে যে মহত্ববোধ আপনি দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি আপনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আজ মহান সংসদে ফিরে এসে আমার মনে হচ্ছে, সংসদ শুধু বিতর্কের জন্য নয়, এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে সুস্থ থাকতে দেন, যাতে আমার নির্বাচনি এলাকার মানুষের জন্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য বাকি সময়টুকু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারি। আমি সহকর্মী সংসদ সদস্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের ভালোবাসা ও শুভকামনা, দোয়া আমাকে এই কঠিন সময় অতিক্রম করার সহায় জুগিয়েছে।'

তিনি বলেন, 'স্পিকার ২০০৬ সালের পর আজ আবার এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই, আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে, মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার জন্য। মহান আল্লাহতাআলা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ দান করুন। স্পিকার আপনাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে আপনার মাধ্যমে সব সংসদ এবং বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার জন্য যথেষ্ট দোয়া করেছেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমার সুস্থতা কামনা করেছেন। দলমত নির্বেশে আমি সবাই সবার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনারা দোয়া করবেন, আমি যাতে বাকি সময়টুকু যদি বেঁচে থাকি দেশ ও জাতির জন্য কিছু করতে পারি। সবাইকে ধন্যবাদ, আসসালামু আলাইকুম।'

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা ৫০ মিনিটে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেন মির্জা আব্বাস। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন পর চিকিৎসা শেষে সংসদে এসেছেন সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস উদ্দিন। এই মহান সংসদে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। এর আগে সকালে তার নিজ কার্যালয়ে দাফতরিক কাজ শুরু করেন মির্জা আব্বাস। সকালে মির্জা আব্বাস সংসদ ভবনে পৌঁছালে তার দফতরের কর্মকর্তা তাকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি তার জন্য নির্ধারিত অফিসে প্রবেশ করেন এবং বেশ কিছু নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রথম দিনের দাফতরিক কার্যক্রমের সূচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নতুন এ দায়িত্ব পালনে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসায় হঠাৎ জ্ঞান হারালে মির্জা আব্বাসকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিনই নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিক্যাল টিম তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে।

পরে ১৫ মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য মির্জা আব্বাসকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে টানা ১ মাস চিকিৎসায় তিনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ১৪ এপ্রিল তাকে ভর্তি করা হয় মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে। সেখানে এতদিন তার ফিজিওফেরাপি চলছিল। সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে ২ সেপ্টেম্বর বুধবার দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত