ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ঢুকল মার্কিন রণতরী
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ‘নির্ভুল হামলা’ চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা চলতি সপ্তাহেই হতে পারে, তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময় পরিবর্তন হতে পারে। সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা বেশ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তারা ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের পরিণতি নিয়ে বিভক্ত মত পোষণ করেন। এক মাস ধরে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রথমে বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানালেও পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণেই ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে। যদিও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতি টেনেছে, তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল সাময়িক বিরতি।

এর আগে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই ধরনের কৌশল নিয়েছিলেন। পরে সেখানে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো তেহরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছাড়েননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারির তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার জন্য অনেক বেশি সামরিকভাবে প্রস্তুত। এরই মধ্যে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। এই সামরিক প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘আব্রাহাম লিংকন’ বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এতে এফ-৩৫, এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, তাদের দেশে হামলার জন্য আরব দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার হলে সেসব দেশও হামলার শিকার হবে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও তুরস্ক ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছে। তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান হামলার পক্ষে রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানায়, তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক কাজে ব্যবহার করতে দেবে না। এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। তবে আগে থেকে সতর্ক করায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলায় নতুন কোনো মার্কিন হামলাকে দেশটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে ইরান আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যেমন—মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশে আধিপত্য বজায় রাখলেও ইরান তেল আবিব ও হাইফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা হলেও কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দেয় এবং সৌদি আরবের কাছে থাড ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার অনুরোধ জানালেও রিয়াদ তা প্রত্যাখ্যান করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ঢুকল মার্কিন রণতরী : ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ। সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা একটি আর্মাদা (যুদ্ধজাহাজের বড় বহর) ইরানের উদ্দেশে পাঠিয়েছি। যদি প্রয়োজন পড়েৃমানে আমি বলছি না যে কোনো কিছু ঘটতে যাচ্ছে, হয়তো এই বহর আমাদের ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না, তবে আমরা তাদের (ইরান) নিবিড় নজরদারির মধ্যে রাখছি।’

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিমান বহকারী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম এবং বেশ কিছু গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বসী যুদ্ধজাহাজ ইরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে এবং আগামী কিছুদিনের মধ্যে ইরানের উপকূলের আশেপাশে এই যুদ্ধজাহাজের বহর অবস্থান নেবে। আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছন, অদূর ভবিষ্যতে যে কোনো সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে ইরান। সেসব হামলা ঠেকাতে আগাম সতর্কতা হিসেবে এই যুদ্ধজাহাজের বহরে কিছু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই বহরে রয়েছে বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরক। চলতি জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চল থেকে এই বহর ইরানের উদ্দেশে রওনা হয়। সে সময় দেশটিতে তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তিক্ততা শুরু হয়েছিল তেহরানের। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তিক্ততর হয়ে ওঠে। গত বছর জুন মাসে এ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতও হয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ব্যাপকমাত্রায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ট্রাম্প সে সময় বলেছিলেন, ইরান যদি বিক্ষোভ দমনে নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করে- তাহলে দেশটিতে ফের সামরিক অভিযান হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই সামরিক অভিযান আর হয়নি, তবে তার পরিবর্তে যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠানোর যে পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন- তা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের একাংশ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত