
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন এবং তার চিন্তা-ভাবনা ও রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এটি ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের ‘অবিচার’। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শন নিয়ে আরও গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মরণে গতকাল রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে এত অল্প পরিসরে তা হয় না। আসলে তার ওপরে গবেষণাটা এত অপ্রতুল। আমার মনে হয় যে, এটা ইতিহাসের প্রতি কিছুটা, এক ধরনের অবিচার করা হচ্ছে। ‘যেসব তরুণেরা উপস্থিত আছেন, তাদের সুযোগ আছে জিয়াউর রহমানের পুরো জীবন, তার চিন্তা-ভাবনাগুলো নিয়ে গবেষণা করার।’ তারমতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি তো একজন বাংলাদেশি, আমাদের এই ব্যাপারটা কিন্তু আগে ছিল না। আমি যে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালি নই, আমি এই ভূখণ্ডের একজন নাগরিক এবং আমার যাওয়ার একটা স্থান আছে, এটা তার (জিয়াউর রহমান) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রসূত। আমি এই কাজটা প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কাজ মনে করি।’ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
তার মতে, ১৯৭৪ সালের ‘দুর্ভিক্ষ পরবর্তী হতাশাগ্রস্ত’ দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে জিয়াউর রহমান ভূমিকা রেখেছিলেন। কৃষি গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, আখ গবেষণা ইনস্টিটিউট, প্রত্যেকটায় গিয়ে দেখবেন যে জিয়াউর রহমানের একটা বড় অবদান আছে।’
জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখার আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জিয়াউর রহমান স্মরণে সেখানে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।
গণমাধ্যমকে অন্ধকার গলি থেকে মুক্ত আকাশে বের করেছিলেন শহীদ জিয়া: মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এবং ১৬ জুনের সংবাদপত্র বাতিলের কালো আইনের মধ্য দিয়ে দেশের গণমাধ্যম যে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়েছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম না হলে সেখান থেকে গণমাধ্যমকে আবার মুক্ত আকাশে বের করা সম্ভব হতো কিনা-ইতিহাসে সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যুগ যুগ ধরে শহীদ জিয়াউর রহমানকে সসম্মানে স্মরণ করতে হবে, কারণ তিনি স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছেন।
গতকাল রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে তিনি এ কথা বলেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে এবং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ূব ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত দুইটার সময় কারো নির্দেশ বা প্ররোচনা ছাড়াই ৩৬ বছর বয়সের একজন বাঙালি মেজর একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক শক্তি সম্পন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেবল নিজের সততা, মূল্যবোধ, চেতনা ও দেশপ্রেমের ওপর ভর করে তিনি ক্যান্টনমেন্ট ও দেশবাসীর সামনে সংকটকালীন সময়ের সমাধানের পুরুষ হিসেবে হাজির হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, যারা ইতিহাস সম্পর্কে অবগত তারা জানেন, ২৫ মার্চের সেই রাতে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা না করলে জাতি দিকনির্দেশনাহীন থাকত। একইভাবে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা যদি তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে না আসত, তবে দেশে শান্তির ছায়া নেমে আসত না।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ওপর হওয়া অসম্মানজনক আচরণকে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রনায়কের মতো হজম করেছেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভর করে দেশের সকল ভিন্ন মতের জন্য সমালোচনা করার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন, তা নজিরবিহীন।
মন্ত্রী আরও বলেন, শহীদ জিয়া বঞ্চিত রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতির মাঠে এনে গঠনমূলক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি চতুর্থ সংশোধনীর সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে দিয়ে কবর দেওয়া পার্লামেন্টকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। ভিন্ন মতকে সম্মান করা এবং বহুমাত্রিক চিন্তার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের গতি নির্ধারণ করাই ছিল তার রাষ্ট্রনায়কোচিত বৈশিষ্ট্য।
গণমাধ্যম সম্পর্কে শহীদ জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর কোনো নেতাই জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না, যদি না তিনি গণমাধ্যমের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা করেন। শহীদ জিয়া শুধু গণমাধ্যমকে অবকাঠামোগত বা আর্থিক সুবিধাই দেননি, বরং গণমাধ্যম যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের পরিচ্ছন্ন আয়না হিসেবে কাজ করতে পারে- সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। তার সেই অবদানের কারণেই সমাজ ও রাষ্ট্র জনগণের কাছে সার্বক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।