ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বললেন প্রশাসক

পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই ইসলামী ব্যাংকে আস্থা রাখুন

* সৎ ও পেশাদারদের সমন্বয়ে ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের দাবি * ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল এবিবি
পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই ইসলামী ব্যাংকে আস্থা রাখুন

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির আমানতকারী ও গ্রাহকদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকের বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। নির্বিঘ্নে লেনদেন চালিয়ে যান এবং ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখুন।’ গতকাল সোমবার রাজধানীর ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হুসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে তিনি আপাতত এক সদস্যবিশিষ্ট বোর্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে খুব শিগগির যোগ্য, দক্ষ ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের জন্য যাচাই-বাছাই চলছে। আমরা এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে চাই, যারা দক্ষতার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা করতে পারবেন। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ বোর্ড গঠন করা সম্ভব হবে।’

এদিকে, ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হুসাইন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ সহায়তা হিসেবে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। তিনি বলেন, ‘গতকালও আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছি। তবে পুরো অর্থ এখনও ব্যবহার করতে হয়নি। আমরা আশা করছি, যারা আতঙ্কে টাকা তুলে নিয়েছেন তারা আবারও ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে ফিরে আসবেন।’

গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বলেও দাবি করেন আলতাফ হুসাইন। তিনি জানান, দেশের একটি বড় শাখার তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় হিসাব বন্ধের (অ্যাকাউন্ট ক্লোজড) সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে এসেছে, যা ইতিবাচক সংকেত বহন করে।

সাবেক চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত গাড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী চেয়ারম্যান একটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। অপসারণের চিঠি হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটি ফেরত নেওয়া হবে।

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুককে পুনর্বহালের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, ‘তিনি এরইমধ্যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং পরিচালনা পর্ষদ তা গ্রহণ করেছে। ফলে তাকে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই।’

সৎ ও পেশাদারদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের দাবি : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল সোমবার রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক। তিনি বলেন, গ্রাহকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের পদত্যাগ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল এবং ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানানো হলেও তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনরায় এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করায় গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে গ্রাহকেরা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আস্থা পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় প্রভাব বিস্তার করে এবং পরবর্তীকালে ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণের নামে বের করে নেয়। এসব অনিয়ম রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও দাবি করেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, জোরপূর্বক দখল করা শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, ব্যাংক লুটেরাদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ঘিরে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, অভিযুক্ত লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ এবং জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে দেওয়া ‘অসত্য বক্তব্য’ প্রত্যাহার।

অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।’ তিনি জানান, এসব দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। দাবিগুলোর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল এবিবি : ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার এবং প্রতিষ্ঠানটিকে নতুনভাবে চালুর সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। গতকাল সোমবার এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। এবিবির এই সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতের জন্য সময়োপযোগী ও দূরদর্শী বলে অভিহিত করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নেওয়ায় এবং ব্যাংকটির পদ্ধতিগত গুরুত্বের কারণে গত ১০ জুন গভর্নরের কাছে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিল এবিবি। সংগঠনটি মনে করে, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান পুরো খাতের জন্যই মঙ্গলজনক। কারণ ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি এখন আর একক কোনো ব্যাংকের সমস্যা নয়, বরং এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতে পড়ছিল। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দিয়েছিল এবিবি। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া সিদ্ধান্তকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে সংগঠনটি আশা প্রকাশ করে, এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠিত হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিশাল আমানত ও বিনিয়োগ, দেশের বৃহত্তম রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নে বড় ভূমিকা থাকায় ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্ছৃঙ্খল জনতার (মব) নানা প্রতিবাদ ব্যাংকটির সুশাসন, তারল্য এবং আমানতকারী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত সেই উদ্বেগ দূর করতে সাহায্য করবে বলে মনে করে এবিবি।

বার্তার শেষে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের স্বার্থে ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ এবং বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি আশা করে এবিবি। একইসঙ্গে, ব্যাংকিং খাতে উচ্ছৃঙ্খল জনতার প্রভাব যে এই শিল্পের জন্য একটি বিপজ্জনক সংকেত তা সব সচেতন নাগরিক উপলব্ধি করবেন বলে আশা প্রকাশ করে সংগঠনটি। এ বিষয়ে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত