ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় পটোলের বাম্পার ফলনে কৃষক দম্পতির নতুন স্বপ্ন

চান্দিনায় পটোলের বাম্পার ফলনে কৃষক দম্পতির নতুন স্বপ্ন

সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে থোকা থোকা পটোল। ভোরের আলো ফুটতেই সেই খেত থেকে পটোল তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন এক গৃহবধূ। পরম যত্ন আর শ্রমে গড়ে তোলা এই পটোল ক্ষেতটি এখন শুধু একটি ফসলি জমি নয়, বরং একটি পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জাদুকরী গল্প। কুমিল্লার চান্দিনা পৌর ব্লকের বড় গোবিন্দপুর গ্রামে এমনই এক অভাবনীয় সাফল্যের গল্প বুনেছেন স্থানীয় কৃষক শাকিল হোসেন এবং তার স্ত্রী। মাত্র ৮ শতাংশ জমিতে পটোল চাষ করে এলাকায় রীতিমতো বাজিমাত করেছেন এই দম্পতি, যা দেখে এখন আশপাশের অনেক চাষিই নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন।

চান্দিনা পৌরসভা এলাকায় সাধারণত প্রথাগত ফসলের চাষই বেশি দেখা যায়। তবে প্রথা ভেঙে নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে কৃষক শাকিল হোসেন এবার বেছে নিয়েছিলেন পটোল চাষকে। এই নতুন উদ্যোগে তার প্রধান সহায় ও দিকনির্দেশক হিসেবে এগিয়ে আসেন চান্দিনা পৌর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার হোসেন। তারই সার্বিক তত্ত্বাবধান, সঠিক পরামর্শ এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় মাত্র ৮ শতাংশ জমিতে পটোলের চারা রোপণ করেন শাকিল। কৃষি বিভাগের সঠিক নির্দেশনা আর কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে কিছুদিনের মধ্যেই পুরো খেত সবুজের সমারোহে ভরে ওঠে।

চান্দিনা পৌর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার হোসেন অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান যে, চান্দিনা পৌরসভাতে এবারই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে পটোলের চাষ করা হয়েছে। প্রথমবার হওয়া সত্ত্বেও ফলন হয়েছে কল্পনাতীত। একে এক কথায় পটোলের বাম্পার ফলন বলা চলে। মাটির গুণাগুণ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে গাছের বৃদ্ধি এবং ফসলের মান দুটোই হয়েছে চমৎকার। তবে এই সাফল্যের পেছনের গল্পটি একটু ভিন্ন এবং অনুপ্রেরণামূলক। পটোল ক্ষেতটি যখন কেবল ডালপালা মেলে বড় হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই পারিবারিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে কৃষক শাকিল হোসেন পাড়ি জমান প্রবাসে। স্বপ্নের ক্ষেতটি দেশে রেখে যাওয়ার সময় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু স্বামীর সেই স্বপ্নকে ম্লান হতে দেননি তার সুযোগ্য স্ত্রী। শাকিল বিদেশে চলে যাওয়ার পর পুরো পটোল ক্ষেতের সার্বিক দেখাশোনা ও পরিচর্যার দায়িত্ব একা হাতে তুলে নেন তিনি। গ্রামীণ নারীরা যে ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে কৃষিতেও সমান অবদান রাখতে পারেন, তিনি তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করা, পানি দেওয়া এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করার কাজটি তিনি একাই সামলান।

বর্তমানে এই খেত থেকে নিয়মিত পটোল তোলা হচ্ছে। শাকিলের স্ত্রী জানান, এখন প্রতি সপ্তাহেই ক্ষেত থেকে তাজা পটোল তোলা হয় এবং স্থানীয় বাজারে তা বেশ ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এই চাষে শুরু থেকে এ পর্যন্ত তাঁদের খরচ হয়েছে মাত্র ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারে পটোলের যে চড়া দাম ও চাহিদা রয়েছে, সেই হিসাব কষে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান যে, সব খরচ বাদ দিয়ে এবার আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। সামান্য পুঁজিতে অল্প সময়ে এত বড় অঙ্কের মুনাফা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল সাড়া ফেলেছে।

কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার হোসেন পটোল চাষের নানাবিধ সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলেন, পটোল এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল যা কৃষকদের টানা অর্থনৈতিক জোগান দেয়।

একবার পটোলের চাষ করলে তা থেকে একটানা ৮ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। এখানেই শেষ নয়, সঠিক উপায়ে যত্ন নিলে এভাবে টানা ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত এক চাষেই ফলন ধরে রাখা যায়, যা অন্য কোনো ফসলে সাধারণত দেখা যায় না। ফলে বারবার জমি প্রস্তুত করা বা চারা কেনার বাড়তি ঝামেলা ও খরচ থাকে না। অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় পটোল চাষে ঝুঁকি কম এবং লাভের পরিমাণ অনেক বেশি।

বাঙালি খাদ্যতালিকায় পটোলের স্থান সব সময়ই ওপরের দিকে। পটোলের তরকারি, ভাজি কিংবা ভর্তা মানুষের অত্যন্ত প্রিয়। বাজারে এর বারোমাসি চাহিদার কারণে কৃষকদের কখনোই লোকসানের মুখে পড়তে হয় না। বড় গোবিন্দপুর গ্রামের এই সফল পরীক্ষাটি প্রমাণ করেছে যে, সঠিক পরামর্শ এবং সঠিক ফসলের নির্বাচন কীভাবে একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

শাকিল হোসেনের প্রবাসের উপার্জনের পাশাপাশি দেশে তার স্ত্রীর এই কৃষি বিপ্লব তাদের সংসারকে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা। চান্দিনা পৌরসভার এই প্রথম পটোল চাষের সাফল্য এখন স্থানীয় অন্য চাষিদের মাঝেও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এখন এই লাভজনক সবজি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা আগামী দিনে এই অঞ্চলের সবজি উৎপাদনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত