
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে নতুন আইনের খসড়ায় এক বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে পর্যবেক্ষেণ তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী এই সংগঠনের মতে, এভাবে আইন পাস হলে কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ক্ষুণ্ণ হবে। তাই খসড়া আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধন করে কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে এক সভায় এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক পরামর্শ সভায় তিনি বলেন, খসড়া আইনে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কমিশনার হতে পারবেন না, কমিশনের সভার লিখিত কার্যবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার এখতিয়ারও বাড়ানো হয়েছে। তবে তার মতে, এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের নভেম্বরে তৎকালীন মানবাধিকার কমিশনের সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন। কোনো চাপের মুখে তারা পদত্যাগ করলেন কি না, তা নিয়ে তখন আলোচনা ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর গেল বছর ৩০ অক্টোবর এখতিয়ার ও কাজের পরিধি বাড়িয়ে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ অনুমোদন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়।
কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ সদস্যদের আরও দুজন ছিলেন আলোচিত গুম কমিশনের সদস্য। তারা হলেন নূর খান ও নাবিলা ইদ্রিস। গেল এপ্রিলে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলনের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। সরকার গত ১৭ মে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’- এর যে খসড়া প্রণয়ন করে। এ নিয়ে টিআইবি আগেও তাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন খসড়ায় সেটি থেকে সরে এসে কমিশনকে সরকারের এক বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। ‘আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে এবং সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে না।’
খসড়া আইনের ১৩ নম্বর ধারার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কমিশনের তদন্ত, পরিদর্শন ও তদারকির ক্ষমতার আওতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা বা নজরদারি সংস্থার সম্ভাব্য গোপন আটককেন্দ্র কিংবা কথিত ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। খসড়ার ২০ নম্বর ধারারও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছে। ‘খসড়া আইনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কাছেই প্রতিকারের এখতিয়ার রাখা হয়েছে। আমরা এর পরিবর্তন চাই। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে যেভাবে ছিল, সেভাবেই রাখতে হবে।’ তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান পুনর্বহাল না করার আহ্বান জানান। নতুন এই আইনটির মোট ৪২ ধারার খসড়া আইনের মধ্যে ১৭টি ধারার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ১৯টি সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি। সরকার এসব সুপারিশ গ্রহণ না করলে টিআইবির অবস্থান কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার বা জাতীয় সংসদ একটি স্বাধীন, কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চায় না- আমরা এমনটাই মনে করি। সেই বিবেচনা থেকেই মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে।’ পর্যবেক্ষণ উপস্থাপনের পর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, অধিকারকর্মী, নারী প্রতিনিধি, দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। আলোচনায় নতুন আইনটি নারী, দলিত, হরিজনসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর হবে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সে বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।