ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার অবৈধ ফার্মেসি এক লাখ

* ৯৩ শতাংশেই নেই ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা * প্রতিমাসে মিলছে ২৩৭টি নতুন লাইসেন্স
নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার অবৈধ ফার্মেসি এক লাখ

মানব জীবনে ওষুধের ভূমিকা অপরিসীম। ওষুধ মানুষের রোগ নিরাময়, আয়ু বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরাসরি কাজ করে। জীবন রক্ষাকারী সেই ওষুধের বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। এই চক্রটি কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং নকল-ভেজাল ওষুধের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কঠোর নজরদারি ও নতুন নীতিমালার পরও বিভিন্ন অসাধু চক্র নানা কৌশলে সাধারণ রোগীদের জিম্মি করছে। বাধ্য হয়ে রোগীদের অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনতে হয়। অথচ যত্রতত্র দেখা যায় ওষুদের ফার্মেসি। দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ডের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি ওষুধের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ফার্মেসি চলছে কোনো ধরনের নিবন্ধন ছাড়াই। অন্যদিকে, নিবন্ধিত সোয়া দুই লাখ ফার্মেসির ৯৩ শতাংশেই নেই ওষুধ সংরক্ষণের ন্যূনতম পরিবেশ বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।

চরম নৈরাজ্যকর এই পরিস্থিতির পরও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) প্রতি মাসে গড়ে ২৩৭টি নতুন ফার্মেসির অনুমোদন দিয়ে চলেছে। কার্যকর তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।

প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ ফার্মেসি

ডব্লিউএইচও’র মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ৫ থেকে ১০টি ওষুধের দোকান থাকা উচিত। সেই হিসাবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ ৯০ হাজার ফার্মেসিই যথেষ্ট। কিন্তু ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে শুধু নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই দুই লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি। এর বাইরে অবৈধভাবে চলছে আরও অন্তত এক লাখ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘উন্নত বিশ্ব তো বটেই, প্রতিবেশী ভারতেও এত কম দূরত্বে ওষুধের দোকান নেই। আমাদের এখানে মুদি দোকানের মতো ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। সরকার জনবসতি বিবেচনায় নিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।’ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দোকান থাকার পরও লাইসেন্স দেওয়ার হিড়িক থামেনি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত নতুন করে ৪ হাজার ২৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখা ‘মডেল ফার্মেসি’র সংখ্যা মাত্র ৭৯টি, যা মোট অনুমোদনের মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

গরমে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের কার্যকারিতা

ডব্লিউএইচও’র গাইডলাইন অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা (জলবায়ুভেদে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি) এবং ৬০ শতাংশের নিচে আপেক্ষিক আর্দ্রতা থাকা বাধ্যতামূলক। সংবেদনশীল ওষুধ ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক কোল্ড চেইন বজায় রাখা জরুরি। তাপমাত্রার হেরফের হলে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে রোগীর উল্টো ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু দেশের নিবন্ধিত ফার্মেসিগুলোর মাত্র ৭ শতাংশ এই মডেল কাঠামোর আওতায় রয়েছে। বাকি ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতেই নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)। রাজধানীর শাহবাগ, আজিজ কো-অপারেটিভ মেডিসিন মার্কেট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীতের মার্কেটগুলো ঘুরে এই ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। শাহবাগের একটি পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক যোগেস চন্দ্র কর্মকার নির্লিপ্তভাবে জানান, ‘ওষুধের মান নষ্ট হতে পারে, এটা জানি। কিন্তু অধিদপ্তর থেকে কখনও এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলা হয়নি।’ অন্যদিকে আজিজ মার্কেটের এক বিক্রেতা জানান, সেন্ট্রাল এসি বসানোর কথা বলে মার্কেট কর্তৃপক্ষ টাকা নিলেও তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মেলে ক্যান্সারের ওষুধ : ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্যান্সারের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ওষুধের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আরও কঠোর। তবে বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পাশের একটি ফার্মেসিতে এক রোগীকে মোবাইলে লেখা নাম দেখিয়ে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই স্তন ক্যানসারের ওষুধ কিনতে দেখা যায়। আইন অমান্য করার বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও সামাজিক অবস্থার কারণে তা শতভাগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’

অবৈধ ফার্মেসি উচ্ছেদে ‘সামাজিক অস্থিরতার’ খোঁড়া যুক্তি : লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও চলছে চরম গাফিলতি। রাজধানীর মিটফোর্ডের অনেক পাইকারি ও খুচরা দোকানে বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই ব্যবসা চলছে। রামপুরার মতো এলাকায় তিন বছর ধরে লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসিও অবাধে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এক লাখ অনিবন্ধিত ফার্মেসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ হিসেবে ডিজিডিএর পরিচালক আকতার হোসেন ‘সামাজিক অস্থিরতা’র মতো অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বড় আকারে অভিযান চালালে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই সংশোধনের জন্য সময় দেওয়া হচ্ছে।’ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের আরেক পরিচালক স্বীকার করেন, মূলত বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অবৈধ দোকান টিকে আছে এবং এদের মাধ্যমেই বাজারে নকল ও ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগে অনীহা : মডেল ফার্মেসির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া এবং ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট জায়গা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাড়তি বেতন দেওয়ার ভয়ে মালিকরা ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দিতে চাইছেন না। এ প্রসঙ্গে ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার বলেন, ‘ফার্মেসির মালিকরা মনে করেন, অষ্টমণ্ডদশম শ্রেণি পাস কর্মীদের দিয়ে যখন কাজ চালানো যাচ্ছে, তখন বেশি বেতন দিয়ে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট কেন রাখবেন? এখানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও ফার্মেসি মালিক- উভয়পক্ষের আন্তরিকতারই চরম ঘাটতি রয়েছে।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত